॥ অধ্যায় ১২, শ্লোক ১০ ॥

অভ্যাসেঽপ্যসমর্থোঽসি মৎকর্মপরমো ভব ।
মদর্থমপি কর্মাণি কুর্বন সিদ্ধিমবাপ্স্যসি ॥ ১২.১০ ॥

সরল ভাবার্থ:

যদি তুমি নিরন্তর অভ্যাস করতেও অসমর্থ হও, তবে আমার প্রীতির জন্য কর্মপরায়ণ হও। আমার উদ্দেশ্যে কর্ম করেও তুমি সিদ্ধি লাভ করবে।

বিস্তারিত বিশ্লেষণ:

কৃষ্ণের করুণা অতুলনীয়। তিনি আরও নিচে নেমে এসে বলছেন—যদি তুমি ধ্যান বা অভ্যাসের সময় বের করতে না পারো, তবে তুমি যা করছ তা-ই আমার জন্য করো। একেই বলে 'সেবা'। তুমি যদি যোদ্ধা হও তবে যুদ্ধ করো কৃষ্ণের জন্য, তুমি যদি কাজ করো তবে তা করো কৃষ্ণের প্রীতির জন্য। মৎকর্মপরমো ভব—অর্থাৎ কৃষ্ণকে খুশি করাই যেন সব কাজের উদ্দেশ্য হয়। এর ফলে কর্ম আর বোঝা থাকে না, কর্ম হয়ে ওঠে উপাসনা। এই শ্লোকটি গৃহস্থদের জন্য পরম আশীর্বাদ। আমাদের সংসার ছাড়া বা গেরুয়া পরার দরকার নেই, কেবল কাজের মোটিভ বা উদ্দেশ্য পরিবর্তন করলেই আমরা আধ্যাত্মিক সিদ্ধি পাব। কৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন—তুমি যুদ্ধের জন্য ধ্যানে বসতে পারছ না তাতে দুঃখ নেই, তুমি আমার নির্দেশ মনে করে যুদ্ধ করো, তাতেও তুমি আমাকেই পাবে। এটিই হলো কর্মকে পবিত্র করার কৌশল।

গভীর দার্শনিক তাৎপর্য ও তত্ত্ব বিশ্লেষণ :

দার্শনিক বিচারে এই শ্লোকটি 'Karma Yoga' এর চূড়ান্ত রূপ। এখানে কাজের ফলের চেয়ে কাজের উদ্দেশ্যকে বড় করে দেখা হয়েছে। যখন কাজের কেন্দ্রবিন্দুতে অহংকারের বদলে ঈশ্বর থাকেন, তখন সেই কাজ মানুষকে মুক্ত করে।

উদাহরণস্বরূপ, একজন ডাক্তার যখন কোনো রোগীকে দেখেন, তিনি যদি ভাবেন যে তিনি টাকা কামাচ্ছেন তবে তা কেবল জাগতিক কাজ। কিন্তু তিনি যদি ভাবেন যে রোগীর ভেতরের যে প্রাণ আছে তা ঈশ্বরেরই অংশ এবং তিনি সেই ঈশ্বরের সেবা করছেন—তবে সেই ডাক্তারি পেশাই তাঁর জন্য পূজা হয়ে দাঁড়াবে। কৃষ্ণ এখানে বলছেন যে কর্মকে অস্বীকার কোরো না, কর্মের ভেতর ঈশ্বরকে খুঁজে নাও। এটিই হলো সহজতম পথ। অর্জুন এখানে এক বড় সমাধান পেলেন যে গাণ্ডীব হাতে নিয়েও তিনি পূর্ণ ভক্ত হয়ে থাকতে পারেন। এই শ্লোকটি আমাদের প্রতিটি কাজকে এক উচ্চতর মর্যাদা দান করে।