॥ অধ্যায় ১, শ্লোক ১৯ ॥

স ঘোষো ধার্তরাষ্ট্রাণাং হৃদয়ানি ব্যদারয়ত্ ।
নভশ্চ পৃথিবীং চৈব তুমুলো ব্যনুনাদয়ন্ ॥ ১৯ ॥

সরল ভাবার্থ

সেই ভয়ংকর শঙ্খধ্বনি আকাশ ও পৃথিবী প্রকম্পিত করে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের (কৌরবদের) হৃদয় বিদীর্ণ করতে লাগল।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

এটি গীতার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শ্লোক, যা ধর্মের প্রভাব বর্ণনা করে। কৌরবরা সংখ্যায় ১১ অক্ষৌহিণী এবং পাণ্ডবরা মাত্র ৭ অক্ষৌহিণী হওয়া সত্ত্বেও কেন কৌরবদের 'হৃদয় বিদীর্ণ' হলো? এর উত্তর নিহিত আছে ধর্মের শক্তিতে। যখন কোনো মানুষ অন্যায়ের পথে থাকে, তখন তার অন্তরাত্মা সবসময় একটি অজানা ভয়ে থাকে। কৌরবরা জানত যে তারা পাণ্ডবদের ন্যায্য পাওনা কেড়ে নিয়েছে, তারা জানত যে তারা দ্রৌপদীকে লাঞ্ছিত করেছে। এই পাপবোধই তাদের পাণ্ডবদের শঙ্খধ্বনির সামনে মানসিকভাবে দুর্বল করে দিয়েছিল। আকাশ ও পৃথিবী প্রকম্পিত হওয়া মানে এটি ছিল এক জাগতিক সংকেত যে, ধর্মের বিজয় এখন অনিবার্য।

শ্রীকৃষ্ণের পাঞ্চজন্য এবং অর্জুনের দেবদত্ত শঙ্খের আওয়াজ যখন কৌরব শিবিরে পৌঁছাল, তখন কৌরব বীরদের কাছে তা কেবল বাদ্যধ্বনি ছিল না, তা ছিল যেন যমদূতের আহ্বান। ধর্মীয় তত্ত্বে একে বলা হয় 'আত্মার ক্রন্দন'। যারা অধার্মিক, তারা বাইরে থেকে দম্ভ দেখালেও তাদের ভিত্তি থাকে খুবই নড়বড়ে। অন্যদিকে পাণ্ডবরা ছিলেন নিশ্চিন্ত, কারণ তাঁদের সারথি স্বয়ং পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা আমাদের শেখায় যে, সত্যের আওয়াজ সবসময়ই উচ্চ এবং প্রভাবশালী। আমাদের জীবনেও যখন আমরা সত্যের পথে থাকি, তখন আমাদের ছোট পদক্ষেপও অন্যদের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। কৌরবদের কোলাহল পাণ্ডবদের মনে কোনো ভয়ের সৃষ্টি করতে পারেনি, কিন্তু পাণ্ডবদের একটি শঙ্খধ্বনিই কৌরবদের পরাজয়ের সূচনা করে দিয়েছিল। এই শ্লোকটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পাপের পরাজয় হয় পাপীর অন্তরেই, অস্ত্রের আঘাত আসার অনেক আগেই।


[ছবি: রণাঙ্গনের ধুলোবালি ও কোলাহলের মাঝে কৌরব সেনারা আতঙ্কে কানের ওপর হাত চেপে ধরছে, অন্যদিকে রথে অর্জুন বীরদর্পে শঙ্খ বাজাচ্ছেন।]