॥ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ॥

অধ্যায় ১: অর্জুনবিষাদযোগ (মোট ৪৭ টি শ্লোক)

॥ শ্লোক ১.১ ॥

ধৃতরাষ্ট্র উবাচ—
ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে সমবেতা যুযুৎসবঃ ।
মামকাঃ পাণ্ডবাশ্চৈব কিমকুর্বত সঞ্জয় ॥

অনুবাদ: ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন: হে সঞ্জয়, ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধ করিবার বাসনায় সমবেত হইয়া আমার পুত্রগণ এবং পাণ্ডুপুত্রগণ কী করিল?
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.২ ॥

সঞ্জয় উবাচ—
দৃষ্ট্বা তু পাণ্ডবানীকং ব্যূহং দুর্যোধনস্তদা।
আচার্যমুপসংগম্য রাজা বচনমব্রবীৎ॥

অনুবাদ: সঞ্জয় কহিলেন: সেই সময় রাজা দুর্যোধন পাণ্ডবদের ব্যূহবদ্ধ সৈন্যবাহিনী দর্শন করিয়া আচার্য দ্রোণের নিকট উপস্থিত হইলেন এবং এই কথা বলিলেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.৩ ॥

পশ্যৈতাং পাণ্ডুপুত্রাণামাচাৰ্য মহতীং চমুম্ ।
ব্যূহং দ্রুপদপুত্রেণ তব শিষ্যেণ ধীমতা ॥

অনুবাদ: (দুর্যোধন বলিলেন) হে আচার্য, আপনার বুদ্ধিমান শিষ্য দ্রুপদ-পুত্র ধৃষ্টদ্যুম্ন কর্তৃক ব্যূহাকারে সজ্জিত পাণ্ডবদের এই বিশাল সেনাবাহিনী দেখুন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.৪ ॥

অত্র শূরা মহেষ্বাসা ভীমার্জুনসমা যুধি ।
যুযুধানো বিরাটশ্চ দ্রুপদশ্চ মহারথঃ ॥

অনুবাদ: এই সেনাবাহিনীতে ভীম ও অর্জুনের সমকক্ষ অনেক বীর মহাধনুর্ধর রহিয়াছেন, যেমন—যুযুধান (সাত্যকি), বিরাট এবং মহারথী দ্রুপদ।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.৫ ॥

ধৃষ্টকেতুশ্চেকিতানঃ কাশীরাজশ্চ বীর্যবান্ ।
পুরুজিত্ কুন্তিভোজশ্চ শৈব্যশ্চ নরপুঙ্গবঃ ॥

অনুবাদ: আরও আছেন—ধৃষ্টকেতু, চেকিতান, বলবান কাশীরাজ, পুরুজিৎ, কুন্তিভোজ এবং নরশ্রেষ্ঠ শৈব্য।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.৬ ॥

যুধামন্যুশ্চ বিক্রান্ত উত্তমৌজাশ্চ বীর্যবান্ ।
সৌভদ্রো দ্রৌপদেয়াশ্চ সর্ব এব মহারথাঃ ॥

অনুবাদ: বিক্রমশালী যুধামন্যু, বলবান উত্তমৌজা, সুভদ্রা-নন্দন (অভিমন্যু) এবং দ্রৌপদীর পুত্রগণ—ইহারা সকলেই মহারথী।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.৭ ॥

অস্মাকং তু বিশিষ্ট যে তান্নিবোধ দ্বিজোত্তম ।
নায়কা মম সৈন্যস্য সংজ্ঞার্থং তান্ ব্রবীমি তে ॥

অনুবাদ: হে দ্বিজশ্রেষ্ঠ, আমাদের পক্ষেও যাহারা বিশেষ বিশেষ যোদ্ধা আছেন, তাঁহাদিগকে জানিয়া নিন। আপনার অবগতির জন্য আমার সেনাবিনীর সেই প্রধান প্রধান নায়কগণের নাম আমি বলিতেছি।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.৮ ॥

ভবান্ ভীষ্মশ্চ কর্ণশ্চ কৃপশ্চ সমিতিঞ্জয়ঃ ।
অশ্বত্থামা বিকর্ণশ্চ সৌমদত্তিস্ তথৈব চ ॥

অনুবাদ: আপনি, ভীষ্ম, কর্ণ, সংগ্রামে জয়ী কৃপাচার্য, অশ্বত্থামা, বিকর্ণ এবং সোমদত্তের পুত্র ভূরিশ্রবাও আছেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.৯ ॥

অন্যে চ বহবঃ শূরা মদর্থে ত্যক্তজীবিতাঃ ।
নানাশস্ত্রপ্রহরণাঃ সর্বে যুদ্ধবিশারদাঃ ॥

অনুবাদ: আরও অনেক বীর আছেন, যাহারা আমার জন্য জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিতে প্রস্তুত। তাঁহারা সকলে বিভিন্ন প্রকারের অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত এবং যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.১০ ॥

অপর্যাপ্তং তদ্ অস্মাকং বলং ভীষ্মাভিরক্ষিতম্ ।
পর্যাপ্তং ত্ব্ ইদং এতেষাং বলং ভীমাভিরক্ষিতম্ ॥

অনুবাদ: আমাদের এই বল ভীষ্ম কর্তৃক সুরক্ষিত হওয়ায় অপ্রতুল (অমিত), কিন্তু ভীম কর্তৃক সুরক্ষিত পাণ্ডবদের বল পর্যাপ্ত (সীমাবদ্ধ)।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.১১ ॥

অয়নেষু চ সর্বেষু যথাভাগম্ অবস্থিতাঃ ।
ভীষ্মম্ এবাভিরক্ষন্তু ভবন্তঃ সর্ব এব হি ॥

অনুবাদ: আপনারা সকলে নিজ নিজ স্থানে অবস্থিত থাকিয়া চারিদিকে ভীষ্মকেই রক্ষা করুন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.১২ ॥

তস্য সংজনয়ন্ হর্ষং কুরুবৃদ্ধঃ পিতামহঃ ।
সিংহনাদং বিনদ্যোচ্চৈঃ শঙ্খং দধ্মৌ প্রতাপবান্ ॥

অনুবাদ: তখন কুরুবংশের বৃদ্ধ পিতামহ ভীষ্ম দুর্যোধনের মনে আনন্দ সঞ্চার করিয়া উচ্চস্বরে সিংহনাদ করিলেন এবং নিজ শঙ্খ বাজাইয়া দিলেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.১৩ ॥

ততঃ শঙ্খাশ্চ ভের্যশ্চ পণবানকগোমুখাঃ ।
সহসৈবাভ্যহন্যন্ত স শব্দস্তুমুলোঽভবৎ ॥

অনুবাদ: অতঃপর শঙ্খ, ভেরী, পণব, আনক ও গোমুখ প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্রসমূহ সহসা বাজিয়া উঠিল, সেই শব্দ অতিশয় তুমুল হইল।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.১৪ ॥

ততঃ শ্বেতৈর্ হয়ৈর্ য়ুক্তে মহতি স্যন্দনে স্থিতৌ ।
মাধবঃ পাণ্ডবশ্চৈব দিব্যৌ শঙ্খৌ প্রদধ্মতুঃ ॥

অনুবাদ: তখন শ্বেত অশ্বযুক্ত এক বিশাল রথে উপবিষ্ট মাধব (শ্রীকৃষ্ণ) এবং পাণ্ডুপুত্র অর্জুনও তাঁহাদের দিব্য শঙ্খদ্বয় বাজাইয়া দিলেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.১৫ ॥

পাঞ্চজন্যং হৃষীকেশো দেবদত্তং ধনঞ্জয়ঃ ।
পৌণ্ড্রং দধ্মৌ মহাশঙ্খং ভীমকর্মা বৃকোদরঃ ॥

অনুবাদ: হৃষীকেশ (শ্রীকৃষ্ণ) পাঞ্চজন্য এবং ধনঞ্জয় (অর্জুন) দেবদত্ত নামক শঙ্খ বাজাইলেন। প্রচণ্ডকর্মা বৃকোদর (ভীমসেন) পৌণ্ড্র নামক মহাশঙ্খ বাজাইলেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.১৬ ॥

অনন্তবিজয়ং রাজা কুন্তীপুত্রো যুধিষ্ঠিরঃ ।
নকুলঃ সহদেবশ্চ সুঘোষমণিপুষ্পকৌ ॥

অনুবাদ: কুন্তীপুত্র রাজা যুধিষ্ঠির অনন্তবিজয় নামক শঙ্খ, এবং নকুল ও সহদেব সুঘোষ ও মণিপুষ্পক নামক শঙ্খ বাজাইলেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.১৭ ॥

কাশ্যশ্চ পরমেষ্বাসঃ শিখণ্ডী চ মহারথঃ ।
ধৃষ্টদ্যুম্নো বিরাটশ্চ সাত্যকিশ্চাপরাজিতঃ ॥

অনুবাদ: পরমধনুর্ধর কাশীরাজ, মহারথী শিখণ্ডী, ধৃষ্টদ্যুম্ন, বিরাট এবং অপরাজেয় সাত্যকি।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.১৮ ॥

দ্রুপদো দ্রৌপদেয়াশ্চ সর্বশঃ পৃথিবীমতে ।
সৌভদ্রশ্চ মহাবাহুঃ শঙ্খান্ দধ্মুঃ পৃথক্ পৃথক্ ॥

অনুবাদ: হে মহারাজ, দ্রুপদ, দ্রৌপদীর পুত্রগণ এবং মহাবাহু সুভদ্রা-নন্দন (অভিমন্যু)—ইহারা সকলেই নিজ নিজ শঙ্খ পৃথক্ পৃথক্ বাজাইলেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.১৯ ॥

স ঘোষো ধার্তরাষ্ট্রাণাং হৃদযানি ব্যদারযৎ ।
নভশ্চ পৃথিবীং চৈব তুমুলো ব্যনুনদযন্ ॥

অনুবাদ: সেই তুমুল শব্দ আকাশ ও পৃথিবী প্রতিধ্বনিত করিয়া ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণের হৃদয় বিদীর্ণ করিল।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.২০ ॥

অথ ব্যবস্থিতান্ দৃষ্ট্বা ধার্তরাষ্ট্রান্ কপিধ্বজঃ ।
প্রবৃত্তে শস্ত্রসম্পাতে ধনুর্ উদ্যম্য পাণ্ডবঃ ॥
হৃষীকেশং তদা বাক্যম্ ইদমাহ মহীপতে ॥

অনুবাদ: হে মহীপতি, অতঃপর কপিধ্বজ অর্জুন যখন দেখিলেন যে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণ ব্যূহাকারে সজ্জিত হইয়া যুদ্ধারম্ভে উদ্যত, তখন তিনি ধনু উত্তোলন করিয়া হৃষীকেশকে (শ্রীকৃষ্ণকে) এই কথা বলিলেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.২১-২২ ॥

অর্জুন উবাচ—
সেনয়োর্ উভয়োর্ মধ্যে রথং স্থাপয় মেঽচ্যুত ।
যাবদ্ এতান্ নিরীক্ষেঽহং যোদ্ধুকামান্ অবস্থিত্বান্ ॥
কৈর্ ময় সহ য়োেদ্ধব্যম্ অস্মিন্ রণসমুদ্যমে ॥

অনুবাদ: অর্জুন কহিলেন: হে অচ্যুত, আমার রথখানি উভয় সেনাদলের মাঝখানে স্থাপন করুন। আমি যাহাদের সহিত এই যুদ্ধ-আয়োজনে যুদ্ধ করিব, যুদ্ধাভিলাষী সেই যোদ্ধাদিগকে একবার দেখিব।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.২৩ ॥

য়োত্স্যমানাান্ অবেক্ষেঽহং য এতেঽত্র সমাগতাঃ ।
ধার্তরাষ্ট্রস্য দুর্মুদ্ধেঃ প্রিয়-চিকীর্ষবঃ ॥

অনুবাদ: দুর্বুদ্ধি দুর্যোধনের প্রিয়-সাধনের ইচ্ছায় যাহারা এখানে সমবেত হইয়াছে, আমি সেই যুদ্ধকামী লোকদিগকে দেখিব।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.২৪ ॥

সঞ্জয় উবাচ—
এবম্ উক্তো হৃষীকেশো গুড়াকেশেন ভারত ।
সেনয়োর্ উভয়োর্ মধ্যে স্থাপয়িত্বা রথোত্তমম্ ॥

অনুবাদ: সঞ্জয় কহিলেন: হে ভারত, গুড়াকেশ (নিদ্রাজয়ী অর্জুন) কর্তৃক এইরূপে আদিষ্ট হইয়া হৃষীকেশ (শ্রীকৃষ্ণ) সেই শ্রেষ্ঠ রথটিকে উভয় সেনাদলের মাঝখানে স্থাপন করিলেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.২৫ ॥

ভীষ্ম-দ্রোণ-প্রমুখতঃ সর্বেষাং চ মহীক্ষিতাম্ ।
উবাচ পাাথ পশ্যৈতান্ সমবেতান্ কুরুন্ ইতি ॥

অনুবাদ: ভীষ্ম ও দ্রোণের সম্মুখে এবং অন্যান্য সমস্ত ভূপালদের সামনে রথ স্থাপন করিয়া তিনি অর্জুনকে বলিলেন, হে পার্থ, সমবেত এই কৌরবগণকে দর্শন কর।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.২৬ ॥

তত্রাপশ্যত্ স্থিতান্ পার্থঃ পিতৃন্ অথ পিতামহান্ ।
আচার্যাান্ মাতুলান্ ভ্রাতৄন্ পুত্রান্ পৌত্রান্ সখীংস্তথা ॥
শ্বশুরাান্ সুহৃদশ্চৈব সেনয়োর্ উভয়োর্ অপি ॥

অনুবাদ: তখন অর্জুন উভয় সেনাবাহিনীর মধ্যে অবস্থিত পিতৃগণকে, পিতামহগণকে, আচার্যগণকে, মাতুলগণকে, ভ্রাতৃগণকে, পুত্রগণকে, পৌত্রগণকে, বন্ধুগণকে, শ্বশুরগণকে এবং সুহৃদগণকে দেখিতে পাইলেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.২৭ ॥

তান্ সমীক্ষ্য স কৌন্তেয়ঃ সর্বান্ বন্ধুন্ অবস্থিতান্।
কৃপয়া পরয়াঽঽবিষ্টো বিষীদন্নিদমব্রবীৎ॥

অনুবাদ: কুন্তীনন্দন অর্জুন যুদ্ধার্থে উপস্থিত সেই সমস্ত বন্ধু-বান্ধবকে দেখিয়া অতিশয় করুণায় আচ্ছন্ন হইয়া বিষাদ সহকারে এই কথা বলিলেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.২৮ ॥

অর্জুন উবাচ—
দৃষ্ট্বেমাং স্বজনান্ কৃষ্ণ যুযুৎসুং সমুপস্থিতম্।
সীদস্তি মম গাত্রাণি মুখং চ পরিশুষ্যতি॥

অনুবাদ: অর্জুন কহিলেন: হে কৃষ্ণ, যুদ্ধ করিবার ইচ্ছায় সম্মুখে সমাগত এই স্বজনদিগকে দেখিয়া আমার সর্বাঙ্গ অবসন্ন হইতেছে এবং মুখ শুষ্ক হইয়া যাইতেছে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.২৯ ॥

বেপথুশ্চ শরীরে মে রোমহর্ষশ্চ জায়তে ।
গাণ্ডীবং স্রংসতে হস্তাত্ত্বক্ চৈব পরিদহ্যতে ॥

অনুবাদ: আমার শরীরে কম্পন হইতেছে, রোমাঞ্চ হইতেছে। হাত হইতে গাণ্ডীব ধনু স্খলিত হইতেছে এবং ত্বক যেন জ্বলিয়া যাইতেছে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.৩০ ॥

ন চ শক্লোম্যবস্থাতুং ভ্রমতীব চ মে মনঃ ।
নিমিত্তানি চ পশ্যামি বিপরীতানি কেশব ॥

অনুবাদ: হে কেশব, আমি স্থির থাকিতে পারিতেছি না, আমার মন যেন ঘূর্ণিত হইতেছে। আমি সমস্তই বিপরীত লক্ষণ দেখিতেছি।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.৩১ ॥

ন চ শ্রেয়োঽনুপশ্যামি হত্বা স্বজনম্ আবহবে ।
ন কাঙ্ক্ষে বিজয়ং কৃষ্ণ ন চ রাজ্যং সুখানি চ ॥

অনুবাদ: হে কৃষ্ণ, যুদ্ধে স্বজনদিগকে বধ করিয়া কোনো শ্রেয় (মঙ্গল) দেখিতেছি না। আমি বিজয়, রাজ্য কিংবা সুখ কিছুই আকাঙ্ক্ষা করি না।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.৩২ ॥

কিং নো রাজ্যেন গোবিন্দ কিং ভোগৈর্ জীবিতেন বা ।
যেষামর্থে কাঙ্ক্ষিতং নো রাজ্যং ভোগাঃ সুখানি চ ॥

অনুবাদ: হে গোবিন্দ, যাঁহাদের জন্য আমরা রাজ্য, ভোগ ও সুখ কামনা করি, তাঁহারা যদি এই যুদ্ধে জীবন ও ধন-সম্পদের আশা ত্যাগ করিয়া সমবেত হইয়াছেন, তবে রাজ্য বা জীবন ধারণ করিয়া আমাদের কী প্রয়োজন?
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.৩৩ ॥

ত ইমেঽবস্থিতা যুদ্ধে প্রাণাংস্ত্যক্ত্বা ধনানি চ ।
আচার্যাঃ পিতরঃ পুত্রাস্ তথৈব চ পিতামহাঃ ॥

অনুবাদ: এই সকল আচার্য, পিতা, পুত্র এবং পিতামহগণ প্রাণ ও ধনের আশা ত্যাগ করিয়া যুদ্ধে সমবেত হইয়াছেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.৩৪ ॥

মাতুলাঃ শ্বশুরাঃ পৌত্রাঃ শ্যালাঃ সম্বন্ধিনস্ তথা ।
এতান্ন হন্তুমিচ্ছামি ঘ্নতোঽপি মধুসূদন ॥

অনুবাদ: হে মধুসূদন, এই মাতুল, শ্বশুর, পৌত্র, শ্যালক এবং অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনগণকে আমি বধ করিতে ইচ্ছা করি না, যদি ইহারা আমাকে বধ করেন, তবুও নহে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.৩৫ ॥

অপি ত্রৈলোক্যরাজ্যস্য হেতোঃ কিং নু মহীকৃতে ।
নিহত্য ধার্তরাষ্ট্রান্ নঃ কা প্রীতিঃ স্যাজ্ জনার্দন ॥

অনুবাদ: হে জনার্দন, ত্রিলোকের রাজ্যের জন্যেও যখন আমি ইহাদিগকে বধ করিতে চাহি না, তখন পৃথিবীর জন্য আর কী বলিব? ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণকে বধ করিলে আমাদের কী আনন্দ হইতে পারে?
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.৩৬ ॥

পাপম্ এবাশ্রয়েদ্ অস্মান্ হত্বৈতান্ আততায়িনঃ ।
তস্মান্ নার্হা বয়ং হন্তুং ধার্তরাষ্ট্রান্ স্ববান্ধবান্ ॥
স্বজনং হি কথং হত্বা সুখিনঃ স্যাম মাধব ॥

অনুবাদ: এই আততায়ীদিগকে বধ করিলে কেবল পাপই আমাদের আশ্রয় করিবে। সেই হেতু ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণকে, আমাদের স্বজনদিগকে বধ করা আমাদের উচিত নহে। হে মাধব, স্বজনদিগকে বধ করিয়া আমরা কিরূপে সুখী হইব?
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.৩৭ ॥

যদ্যপ্যেতে ন পশ্যন্তি লোভোপহতচেতসঃ ।
কুলক্ষয়কৃতং দোষং মিত্রদ্রোহে চ পাতকম্ ॥

অনুবাদ: যদিও এই সমস্ত লোক লোভের দ্বারা বুদ্ধিভ্রষ্ট হওয়ায় কুলক্ষয়জনিত দোষ এবং মিত্রদ্রোহজনিত পাপ দেখিতে পাইতেছে না।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.৩৮ ॥

কথং ন জ্ঞেয়ম্ অস্মাভিঃ পাপাদ্ অস্মান্ নিবর্ত্তিতুম্ ।
কুলক্ষয়কৃতং দোষং প্রপশ্যদ্ভির্ জনার্দন ॥

অনুবাদ: হে জনার্দন, কুলক্ষয়জনিত দোষ প্রত্যক্ষ করিয়াও আমরা কেন এই পাপ হইতে নিবৃত্ত হইবার কথা চিন্তা করিব না?
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.৩৯ ॥

কুলক্ষয়ে প্রণশ্যন্তি কুলধর্মাঃ সনাতনাঃ ।
ধর্মে নষ্টে কুলং কৃৎস্নম্ অধর্মোঽভিভবত্য্ উত ॥

অনুবাদ: কুলক্ষয় হইলে সনাতন কুলধর্মসমূহ বিনষ্ট হয়; আর ধর্ম নষ্ট হইলে সমস্ত কুলকেই অধর্ম সম্পূর্ণরূপে অভিভূত করে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.৪০ ॥

অধর্ম্ভাবা ত্ কৃষ্ণ প্রদুস্য ়ন্তি কুল-স্ত্রিয়ঃ ।
স্ত্রীষু দুষ্টাসু বাষ্ণেয় জায়তে বর্ণসঙ্করঃ ॥

অনুবাদ: হে কৃষ্ণ, অধর্মের প্রভাবে কুলস্ত্রীগণ দূষিত হয়; হে বাষ্ণেয়, স্ত্রীগণ দূষিত হইলে বর্ণসঙ্কর উৎপন্ন হয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.৪১ ॥

সঙ্করো নরকায়ৈব কুলঘ্নানাং কুলস্য চ ।
পতন্তি পিতরো হ্যেবং লুপ্তপিণ্ডোদকক্রিয়াঃ ॥

অনুবাদ: বর্ণসঙ্কর কুলঘাতক এবং সেই কুলের নরকের কারণ হয়। পিণ্ডদান ও তর্পণক্রিয়া লুপ্ত হওয়ায় পিতৃপুরুষগণও পতিত হন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.৪২ ॥

দোষৈর্ এতৈঃ কুলঘ্নানাং বর্ণসঙ্করকারকৈঃ ।
উত্সাদ্যন্তে জাতিধর্মাঃ কুলধর্মাশ্চ শাশ্বতাঃ ॥

অনুবাদ: এই সকল কুলঘাতকদের বর্ণসঙ্কর সৃষ্টিকারী দোষের ফলে সমাজের জাতিধর্মসমূহ এবং চিরন্তন কুলধর্মসমূহ বিলুপ্ত হয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.৪৩ ॥

উত্সন্নকুলধর্মাণাং মনুষ্যাণাং জনার্দন ।
নরকে নিয়তং বাসো ভবত্য্ ইত্য্ অনুশুশ্রুম ॥

অনুবাদ: হে জনার্দন, আমরা পরম্পরাক্রমে শুনিয়া আসিতেছি যে, যাহাদের কুলধর্ম নষ্ট হইয়া যায়, সেই সব মানুষদের চিরকাল নরকে বাস করিতে হয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.৪৪ ॥

অহোে বত মহত্ পাপং কর্ত্তুং ব্য ব-সিতাা বয়ম্ ।
য়দ্ রাজ্য-সুখ-লোেভেন হন্তুং স্বজনম্ উদ্য তাাঃ ॥

অনুবাদ: হা কষ্ট! আমরা রাজ্যসুখের লোভে স্বজনদিগকে বধ করিতে উদ্যত হইয়া কত মহা পাপ করিতে কৃতসংকল্প হইয়াছি।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.৪৫ ॥

যদি মাম্ অপ্রতীকারম্ অশস্ত্রং শস্ত্রপাণয়ঃ ।
ধার্তরাষ্ট্রা রণ হন্যুস্ তন্ মে ক্ ষেমতরং ভবেত্ ॥

অনুবাদ: যদি ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রেরা আমাকে নিরস্ত্র এবং প্রতিরোধে অনিচ্ছুক অবস্থায় রণক্ষেত্রে বধ করে, তাহাও আমার পক্ষে অধিকতর মঙ্গলজনক হইবে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.৪৬ ॥

সঞ্জয় উবাচ—
এবম্ উক্ত্বাঽর্জুনঃ সঙ্খে রথোপস্থ উপাবিশৎ।
বিসৃজ্য সশরং চাপং শোকসংবিগ্নমানসঃ॥

অনুবাদ: সঞ্জয় কহিলেন: রণক্ষেত্রে এই কথা বলিয়া শোকসন্তপ্তচিত্ত অর্জুন শরাসন (ধনু) ও বাণসমূহ পরিত্যাগপূর্বক রথের উপরে বসিয়া পড়িলেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১.৪৭ ॥

সঞ্জয় উবাচ—
ইত্য্ অর্জুনঃ সঙ্খে রথোপস্থ উপাবিশত্ ।
বিসৃজ্য সশরং চাপং শোেকসংবিগ্নমানসঃ ॥

অনুবাদ: সঞ্জয় কহিলেন: (পুনরায় বলিতেছি) এই বলিয়া অর্জুন রণস্থলে ধনুর্বাণ পরিত্যাগপূর্বক শোকাকুল চিত্তে রথের উপর উপবিষ্ট হইলেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ ইতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসু উপনিষত্সু ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে অর্জুনবিষাদযোগ নাম প্রথমআধ্যায় ॥

এইভাবে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা উপনিষদের ব্রহ্মবিদ্যা এবং যোগশাস্ত্রের অন্তর্গত শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের সংবাদে 'অর্জুনবিষাদযোগ' নামক প্রথম অধ্যায় সমাপ্ত হলো।