॥ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ॥

অধ্যায় ২: সাংখ্য যোগ (মোট ৭২ টি শ্লোক)

॥ শ্লোক ২.১ ॥

সঞ্জয় উবাচ ।
তং তথা কৃপয়াবিষ্টম্ অশ্রুপূর্ণাকুলেক্ষণম্ ।
বিষীদন্তম ইদং বাক্যম্ উবাচ মধুসূদনঃ ॥

অনুবাদ: সঞ্জয় বললেন: করুণায় অভিভূত, অশ্রুপূর্ণ ও ব্যাকুল চোখযুক্ত বিষণ্ন অর্জুনকে মধুসূদন (শ্রীকৃষ্ণ) এই কথাগুলি বললেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.২ ॥

শ্রীভগবান্ উবাচ ।
কুতস্ত্বা কশ্মলম ইদং বিষমে সমুপস্থিতম্ ।
অনার্যজুষ্টম অস্বর্গ্যম্ অকীর্তিকরম অর্জুন ॥

অনুবাদ: শ্রীভগবান্ বললেন: হে অর্জুন, এই সংকটকালে তোমার এই অনার্যচিত, স্বর্গপ্রাপ্তির বাধক ও অকীৰ্তিকৰ মোহ কোথা থেকে এল?
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৩ ॥

ক্লৈব্যং মা স্ম গমঃ পার্থ নৈতত্ ত্বয্যুপপদ্যতে ।
ক্ষুদ্রং হৃদয়দৌর্বল্যং ত্যক্ত্বোত্তিষ্ঠ পরন্তপ ॥

অনুবাদ: হে পার্থ, পৌরুষহীন হয়ো না। এই ক্লীবতা (নপুংসকতা) তোমার যোগ্য নয়। হে পরন্তপ, হৃদয়ের এই ক্ষুদ্র দুর্বলতা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়াও।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৪ ॥

অর্জুন উবাচ ।
কথং ভীষ্মমহং সংখ্যে দ্রোণং চ মধুসূদন ।
ইষুভিঃ প্রতিযোত্স্যামি পূজার্হাবরিসূদন ॥

অনুবাদ: অর্জুন বললেন: হে মধুসূদন, হে অরিসূদন, আমি কীভাবে এই যুদ্ধে পূজনীয় ভীষ্ম ও দ্রোণের বিরুদ্ধে বাণ দ্বারা যুদ্ধ করব?
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৫ ॥

গুরুন্ অহত্বা হি মহানুভাবান্
শ্রেয়ো ভোক্তুং ভৈক্ষ্যম অপীহ লোকে ।
হত্বাঽর্থকামাংস্তু গুরূন্ ইহৈব
ভুঞ্জীয় ভোগান্ রুধিরপ্রদিগ্ধান্ ॥

অনুবাদ: এই জগতে মহানুভব গুরুদের হত্যা না করে বরং ভিক্ষা করে জীবন ধারণ করা শ্রেয়। কারণ গুরুদের হত্যা করলে এই জীবনে রুধির-মাখা অর্থ ও কামভোগ ভোগ করতে হবে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৬ ॥

ন চৈতদ্ বিদ্মঃ কতরন্ নো গরীয়ো
যদ্ বা জয়েম য়দি বা নো জয়েয়ুঃ ।
যানেব হত্বা ন জিজীবিষামস্
তেঽবস্থিতাঃ প্রমুখে ধার্তরাষ্ট্রাঃ ॥

অনুবাদ: আমাদের পক্ষে কোনটি শ্রেয়, তা আমরা জানি না— হয় আমরা তাদের জয় করব, নয়তো তারা আমাদের জয় করবে। যাদের হত্যা করে আমরা বাঁচতে চাই না, সেই ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রেরা (দুর্যোধন ও তার দল) আমাদের সামনে উপস্থিত রয়েছে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৭ ॥

কার্পণ্যদোষোপহতস্বভাবঃ
পৃচ্ছামি ত্বাং ধর্মসংমূঢচেতাঃ ।
য়চ্ছ্রেয়ঃ স্যান্ নিশ্চিতং ব্রূহি তন্ মে
শিষ্যস্তেঽহং শাধি মাং ত্বাং প্রপন্নম্ ॥

অনুবাদ: কৃপণতাদোষে আমার স্বভাব নষ্ট হয়েছে, এবং ধর্ম সম্বন্ধে আমার চিত্ত বিভ্রান্ত। যা নিশ্চিতভাবে শ্রেয়স্কর, তা আমাকে বলো। আমি তোমার শিষ্য, শরণাগত আমাকে শিক্ষা দাও।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৮ ॥

ন হি প্রপশ্যামি মমাপনুদ্য়াদ্
য়চ্ছোকম উচ্ছোষণম ইন্দ্রিয়়াণাম্ ।
অবাপ্য ভূমাব অসপত্নম্ ঋদ্ধং
রাজ্যং সুরাণাম অপি চাধিপত্যম্ ॥

অনুবাদ: পৃথিবীতে শত্রুমুক্ত ঐশ্বর্যপূর্ণ রাজ্য এবং দেবগণের আধিপত্য লাভ করলেও যে শোক আমার ইন্দ্রিয়গুলিকে শুকিয়ে দিচ্ছে, তা দূর করার কোনো উপায় আমি দেখছি না।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৯ ॥

সঞ্জয় উবাচ ।
এবম্ উক্ত্বা হৃষীকেশং গুডাকেশঃ পরন্তপ ।
ন য়োত্স্য ইতি গোবিন্দম্ উক্ত্বা তূষ্ণীং বভূব হ ॥

অনুবাদ: সঞ্জয় বললেন: হে পরন্তপ (ধৃতরাষ্ট্র), গুডাকেশ (অর্জুন) হৃষীকেশকে (কৃষ্ণকে) এভাবে বলে, 'আমি যুদ্ধ করব না' বলে গোবিন্দকে সম্বোধন করে চুপ করে গেলেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.১০ ॥

তম্ উবাচ হৃষীকেশঃ প্রহসন্নিব ভারত ।
সেনয়োর্ উভয়োর্মধ্যে বিষীদন্তম ইদং বচঃ ॥

অনুবাদ: হে ভারত (ধৃতরাষ্ট্র), দুই সেনার মাঝখানে বিষাদগ্রস্ত সেই অর্জুনকে হৃষীকেশ (কৃষ্ণ) হাসতে হাসতে এই কথাগুলি বললেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.১১ ॥

শ্রীভগবান্ উবাচ ।
অশোচ্যান্ অন্বশোচস্ ত্বং প্রজ্ঞাবাদাংশ্চ ভাষসে ।
গতাসূন অগতাসূংশ্চ নানুশোচন্তি পণ্ডিতাঃ ॥

অনুবাদ: শ্রীভগবান্ বললেন: তুমি তাদের জন্য শোক করছ যাদের জন্য শোক করা উচিত নয়, অথচ তুমি পাণ্ডিত্যপূর্ণ কথা বলছ। পণ্ডিতেরা মৃত বা জীবিত কারোর জন্যই শোক করেন না।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.১২ ॥

ন ত্বেবাহং জাতু নাসং ন ত্বং নেমে জনাধিপাঃ ।
ন চৈব ন ভবিষ্য়ামঃ সর্বে বয়ম অতঃ পরম্ ॥

অনুবাদ: এমন কখনো ছিল না যখন আমি ছিলাম না, অথবা তুমি ছিলে না, অথবা এই রাজারা ছিল না; আর ভবিষ্যতেও এমন হবে না যে আমরা সবাই থাকব না।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.১৩ ॥

দেহিনোঽস্মিন্ য়থা দেহে কৌমারং যৌবনং জরা ।
তথা দেহান্তরপ্রাপ্তির্ ধীরস্তত্র ন মুহ্যতি ॥

অনুবাদ: দেহীর যেমন এই দেহে শৈশব, যৌবন ও বার্ধক্য হয়, তেমনই এক দেহ থেকে অন্য দেহে প্রাপ্তি হয়। জ্ঞানী ব্যক্তিরা এতে মোহাচ্ছন্ন হন না।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.১৪ ॥

মাত্রাস্পর্শাস্তু কৌন্তেয় শীতোষ্ণসুখদুঃখদাঃ ।
আগমাপায়িনোঽনিত্যাস্তাঁস্তিতিক্ষস্ব ভারত ॥

অনুবাদ: হে কুন্তীপুত্র, ইন্দ্রিয়গুলির সাথে বিষয়ের সংযোগই শীত-উষ্ণ, সুখ-দুঃখের মতো অনুভূতি দেয়। এগুলি আসে ও যায়, অনিত্য— হে ভারত, তুমি সেইগুলিকে সহ্য করো।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.১৫ ॥

য়ম্ হি ন ব্যথয়ন্ত্য়েতে পুরুষং পুরুষর্ষভ ।
সমদুঃখসুখং ধীরং সোপি অমৃতত্বায় কল্পতে ॥

অনুবাদ: হে পুরুষশ্রেষ্ঠ, যে ধীর পুরুষ সুখ-দুঃখে সম এবং এইগুলি দ্বারা ব্যথিত হন না, তিনিই অমরত্ব (মোক্ষ) লাভের যোগ্য হন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.১৬ ॥

নাসতো বিদ্য়তে ভাবো নাভাবো বিদ্য়তে সতঃ ।
উভয়োর অপি দৃষ্টোঽন্তস্ ত্বনয়োস্তত্ত্বদর্শিভিঃ ॥

অনুবাদ: অসতের (অনিত্য বস্তুর) কোনো অস্তিত্ব নেই এবং সতের (নিত্য বস্তুর) কোনো বিনাশ নেই। তত্ত্বদ্রষ্টা (সত্যদ্রষ্টা) ব্যক্তিরা এই উভয়েরই তত্ত্ব উপলব্ধি করেছেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.১৭ ॥

অবিনাশী তু তদ্ বিদ্ধি য়েন সর্বম ইদং ততং ।
বিনাশম অব্যয়স্যাস্য ন কশ্চিত্ কর্তুম অর্হতি ॥

অনুবাদ: যা দ্বারা এই সমস্ত জগৎ পরিব্যাপ্ত, তাকে অবিনাশী বলে জানো। এই অব্যয় (অবিনাশী) সত্তার বিনাশ ঘটাতে কেউ সক্ষম নয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.১৮ ॥

অন্তবন্ত ইমে দেহ নিতা্য়স্যোক্তাঃ শরীরিণঃ ।
অনাশিনোঽপ্রমেয়়স্য তস্মাদ্ য়ুধ্য়স্ব ভারত ॥

অনুবাদ: এই সমস্ত শরীরকে বিনাশী বলে বলা হয়েছে, কিন্তু এর ভেতরের নিত্য, অবিনাশী এবং অপ্রমেয় (অনুপমেয়) আত্মা চিরন্তন। অতএব, হে ভারত, তুমি যুদ্ধ করো।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.১৯ ॥

য় এনং বেত্তি হন্তারং য়শ্চৈনং মন্যতে হতম্ ।
উভৌ তৌ ন বিজানীতৌ নায়ং হন্তি ন হন্য়তে ॥

অনুবাদ: যে ব্যক্তি এই আত্মাকে হত্যাকারী বলে জানে এবং যে একে হত (মৃত) বলে মনে করে, তারা উভয়েই সত্য জানে না। কারণ আত্মা কাউকে হত্যাও করে না বা হতও হয় না।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.২০ ॥

ন জায়়তে ম্রিয়়তে বা কদাচিন্
নায়়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়়ঃ ।
অজো নিত্য়ঃ শাশ্বতোঽয়ং পুরাণো
ন হন্য়তে হন্য়মানে শরীরে ॥

অনুবাদ: আত্মা কখনো জন্মগ্রহণ করে না বা কখনো মৃত্যুবরণ করে না; একে সৃষ্টি করা হয়েছিল যে আবার হবে, তাও নয়। ইনি অজ (অনাদি), নিত্য, শাশ্বত ও পুরাতন; শরীর নষ্ট হলেও ইনি নিহত হন না।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.২১ ॥

বেদাঽবিনাশিনং নিত্য়ং য় এনম অজম অব্যয়়ম্ ।
কথং স পুরুষঃ পার্থ কং ঘাতয়়তি হন্তি কম্ ॥

অনুবাদ: হে পার্থ, যে পুরুষ এই আত্মাকে অবিনাশী, নিত্য, অজ (অনাদি) ও অব্যয় (অপরিবর্তনীয়) বলে জানেন, তিনি কীভাবে কাউকে হত্যা করেন বা করান?
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.২২ ॥

বাসাংসি জীর্ণানি য়থা বিহায়়
নবানি গৃহ্ণাতি নরোঽপরাণি ।
তথা শরীরাণি বিহায়় জীর্ণা্
ন্য়ানিসংয়়াতি নবানি দেহী ॥

অনুবাদ: মানুষ যেমন পুরনো পোশাক ত্যাগ করে নতুন পোশাক পরিধান করে, তেমনই দেহী (আত্মা) পুরনো ও জীর্ণ শরীর ত্যাগ করে অন্য নতুন শরীর গ্রহণ করে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.২৩ ॥

নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ ।
ন চৈনং ক্লেদয়ন্ত্য় আপো ন শোষয়়তি মারুতঃ ॥

অনুবাদ: শস্ত্র (অস্ত্র) আত্মাকে ছেদন করতে পারে না, আগুন একে দগ্ধ করতে পারে না, জল একে ভেজাতে পারে না, এবং বাতাস একে শুষ্ক করতে পারে না।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.২৪ ॥

অচ্ছেদ্যোঽয়ম অদাহ্যোঽয়ম অক্লেদ্যোঽশোষ্য় এব চ ।
নিতা্য়ঃ সর্বগতঃ স্থাণুর অচলোঽয়ং সনাতনঃ ॥

অনুবাদ: এই আত্মা ছেদন করার অযোগ্য, দগ্ধ করার অযোগ্য, ভেজানোর অযোগ্য এবং শুষ্ক করারও অযোগ্য। ইনি নিত্য, সর্বব্যাপী, স্থির, অচল ও সনাতন (চিরন্তন)।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.২৫ ॥

অব্যক্তোঽয়ম অচিন্ত্যোঽয়ম অবিকার্যোঽয়ম উচ্য়তে ।
তস্মাদ এবং বিদিত্বৈনং নানুশোচিতুম অর্হসি ॥

অনুবাদ: এই আত্মাকে অব্যক্ত (অদৃশ্য), অচিন্ত্য (চিন্তার অযোগ্য) এবং অবিকারী (পরিবর্তনহীন) বলে বলা হয়। অতএব, একে এইরকম জেনে তোমার আর শোক করা উচিত নয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.২৬ ॥

অথ চৈনং নিতা্য়জাতং নিতা্য়ং বা মন্য়সে মৃতম্ ।
তথাপি ত্বং মহাবাহো নৈনং শোচিতুম অর্হসি ॥

অনুবাদ: আর যদি তুমি একে নিত্য জন্ম নেয় ও নিত্য মরে যায় বলে মনে করো, হে মহাবাহু, তাহলেও তোমার শোক করা উচিত নয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.২৭ ॥

জাতস্য় হি ধ্রুবো মৃত্যুর্ ধ্রুবং জন্ম মৃতস্য় চ ।
তস্মাদ অপরিহার্যেঽর্থে ন ত্বং শোচিতুম অর্হসি ॥

অনুবাদ: কারণ, যার জন্ম হয়েছে তার মৃত্যু নিশ্চিত, আর যার মৃত্যু হয়েছে তার জন্মও নিশ্চিত। তাই যা অনিবার্য, সেই বিষয়ে তোমার শোক করা উচিত নয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.২৮ ॥

অব্যক্তাদীনি ভূতানি ব্যক্তমধ্যাানি ভারত ।
অব্যক্তনিধনান্যেব তত্র কা পরিদেবনা ॥

অনুবাদ: হে ভারত, সমস্ত প্রাণী প্রথমে ছিল অব্যক্ত (অপ্রকাশিত), মাঝে প্রকাশিত হয় এবং শেষে আবার অব্যক্ত হয়ে যায়। এতে শোক করার কী আছে?
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.২৯ ॥

আশ্চর্য়বত্ পশ্য়তি কশ্চিদ এনম্
আশ্চর্য়বদ বদতি তথৈব চান্য়ঃ ।
আশ্চর্য়বচ্চৈনম অন্য়ঃ শৃণোতি
শ্রুত্বাঽপ্য়েনং বেদ ন চৈব কশ্চিত্ ॥

অনুবাদ: কেউ আত্মাকে আশ্চর্যের মতো দেখেন, কেউ আশ্চর্যের মতো এর কথা বলেন, আবার কেউ আশ্চর্যের মতো এর কথা শোনেন; এবং শুনেও কেউ কেউ একে মোটেই জানতে পারে না।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৩০ ॥

দেহী নিতা্য়ম অবধ্য়োঽয়ং দেহে সর্বস্য় ভারত ।
তস্মাত্ সর্বাণি ভূতানি ন ত্বং শোচিতুম অর্হসি ॥

অনুবাদ: হে ভারত, এই দেহী (আত্মা) সর্বদা সমস্ত দেহে অবধ্য (অবিনাশী)। অতএব, তোমার কোনো প্রাণীর জন্যই শোক করা উচিত নয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৩১ ॥

স্বধর্মম অপি চাবেক্ষ্য় ন বিকম্পিতুম অর্হসি ।
ধর্ম্যাদ্ধি যুদ্ধাচ্ছ্রেয়োহন্যৎ ক্ষত্রিয়স্য ন বিদ্যতে ॥

অনুবাদ: তুমি তোমার স্বধর্মের দিকেও লক্ষ্য করে বিচলিত হবে না। কারণ, ক্ষত্রিয়ের পক্ষে ধর্মযুদ্ধ অপেক্ষা শ্রেয় আর কিছুই নেই।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৩২ ॥

যদৃচ্ছয়া চোপপন্নং স্বর্গদ্বারম অপাবৃতম্ ।
সুখিনঃ ক্ষত্রি্য়াঃ পার্থ লভন্তে য়ুদ্ধম ইদৃশম্ ॥

অনুবাদ: হে পার্থ, যে ক্ষত্রিয়েরা স্বেচ্ছায় উপস্থিত, মুক্ত স্বর্গদ্বার-স্বরূপ এমন যুদ্ধ লাভ করেন, তারা সুখী।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৩৩ ॥

অথ চেত্ত্বমিমং ধর্ম্যাং সংগ্রামং ন করিষ্যসি।
ততঃ স্বধর্মং কীর্তিং চ হিত্বা পাপমবাস্প্যসি।।

অনুবাদ: আর যদি তুমি এই ধর্মযুদ্ধ না করো, তবে তুমি তোমার স্বধর্ম ও যশ (কীর্তি) ত্যাগ করে পাপ লাভ করবে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৩৪ ॥

অকীর্তিং চাপি ভূতানি কথয়িষ্যন্তি তেঽব্য়য়়াম্ ।
সম্ভাবিতস্য় চাকীর্তির্ মরণাদ্ অতিরিচ্য়তে ॥

অনুবাদ: লোকেরা তোমার চিরস্থায়ী অপযশ (অকীর্তি) বর্ণনা করবে। সম্মানিত মানুষের পক্ষে অপযশ তো মরণের চেয়েও গুরুতর।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৩৫ ॥

ভয়়াদ রণাদ উপরতং মংস্য়ন্তে ত্বাং মহারথাঃ ।
য়েষাং চ ত্বং বহুমতো ভূত্বা য়াস্য়সি লাঘবম্ ॥

অনুবাদ: যে মহারথেরা তোমাকে খুব সম্মান করেন, তারা মনে করবেন যে তুমি ভয় পেয়ে যুদ্ধ থেকে বিরত হয়েছ। ফলে তুমি তাদের কাছে হালকা হয়ে যাবে (সম্মান হারাবে)।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৩৬ ॥

অবাচ্য়বাদাংশ্চ বহুন্ বদিষ্যন্তি তবাহিতাঃ ।
নিন্দন্তস্ তব সামর্থ্য়ং ততো দুঃখতরং নু কিম্ ॥

অনুবাদ: তোমার শত্রুরা তোমার সামর্থ্যকে নিন্দা করে অনেক অপ্রিয় কথা বলবে। তার চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে?
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৩৭ ॥

হতোে বা প্রাপ্স্য়সি স্বর্গং জিত্বা বা ভোক্ষ্য়সে মহীম্ ।
তস্মাদ্ উত্তিষ্ঠ কৌন্তেয় য়ুদ্ধায়় কৃতনিশ্চয়়ঃ ॥

অনুবাদ: নিহত হলে তুমি স্বর্গ লাভ করবে, আর জয়ী হলে পৃথিবী ভোগ করবে। অতএব, হে কুন্তীপুত্র, তুমি যুদ্ধের জন্য কৃতনিশ্চয় হয়ে ওঠো।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৩৮ ॥

সুখদুঃখে সমে কৃত্বা লাভালাভৌ জয়়াজয়়ৌ ।
ততো য়ুদ্ধায়় য়ুজ্য়স্ব নৈবং পাপম অবাপ্স্য়সি ॥

অনুবাদ: সুখ-দুঃখ, লাভ-অলাভ এবং জয়-পরাজয়কে সমান জ্ঞান করে তারপর যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও। এইভাবে তুমি কোনো পাপ লাভ করবে না।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৩৯ ॥

এষা তেঽভিহিতা সাংখ্যে বুদ্ধির্ য়োগে ত্বিмам শৃণু ।
বুদ্ধা যুক্তো যয়া পার্থ কর্মবন্ধং প্রহাস্যসি ॥

অনুবাদ: হে পার্থ, এই জ্ঞান তোমাকে সাংখ্য (তত্ত্বজ্ঞান)-এর প্রসঙ্গে বলা হলো। এবার কর্মযোগের বিষয়ে শোনো, যে বুদ্ধি দ্বারা যুক্ত হয়ে তুমি কর্মবন্ধন সম্পূর্ণ ত্যাগ করতে পারবে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৪০ ॥

নেহাভিক্রমনাশোঽস্তি প্রত্য়বায়়ো ন বিদ্য়তে ।
স্বল্পমপ্যস্য ধর্মস্য ত্রায়তে মহতো ভয়াৎ ॥

অনুবাদ: এই (নিষ্কাম কর্ম) যোগে কোনো আরম্ভের (চেষ্টার) বিনাশ নেই, এবং কোনো বিপরীত ফলও হয় না। এই ধর্মের সামান্য অংশও মানুষকে মহাভয় (জন্ম-মৃত্যুর ভয়) থেকে রক্ষা করে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৪১ ॥

ব্যবসায়াত্মিকা বুদ্ধির্ একেহ কুরুনন্দন ।
বহুশাখা হ্য়নন্তাশ্চ বুদ্ধয়োঽব্য়বসায়িনাম্ ॥

অনুবাদ: হে কুরুনন্দন, এই পথে কেবল একটিই নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধি হয়। কিন্তু যারা অস্থিরচিত্ত, তাদের বুদ্ধি বহুশাখা ও অনন্ত হয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৪২-৪৪ ॥

যামিমাং পুষ্পিতাং বাচং প্রবদন্ত্যবিপশ্চিতঃ ।
বেদবাদরতাঃ পার্থ নান্য়দ অস্তী তি বাদিনঃ ॥
কামাত্মানঃ স্বর্গপরা জন্মকর্মফলপ্রদাম্ ।
ক্রি়য়়াবিশেষবহুলাং ভোগৈশ্বর্য়গতিং প্রতি ॥
ভোগৈশ্বর্য়প্রসক্তানাং তয়়াপহৃতচেতসাম্ ।
ব্যবসায়াত্মিকা বুদ্ধিঃ সমাধৌ ন বিধী়য়়তে ॥

অনুবাদ: হে পার্থ, যে অবিবেকী লোকেরা বেদবাক্যে আসক্ত এবং যারা বলে, 'এর বাইরে আর কিছু নেই'; যারা কামনাবশে স্বৰ্গকেই পরম লক্ষ্য মনে করে এবং যা জন্ম ও কর্মফল দেয়, সেই ভোগ ও ঐশ্বর্যের পথে নিয়ে যায় এমন ক্রিয়া-বিশেষ-বহুল পুষ্পিত বাক্য বলে, সেই বাক্য দ্বারা যাদের মন অপহৃত হয়েছে এবং যারা ভোগ ও ঐশ্বর্যে আসক্ত, তাদের নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধি সমাধিতে (ঈশ্বরে) স্থির হয় না।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৪৫ ॥

ত্রৈগুণ্য়বিষয়া বেদা নিস্ত্রৈগুণ্যো ভব অর্জুন ।
নির্দ্বন্দ্বো নিত্য়সত্ত্বস্থো নির্যোগক্ষেম আত্মবান্ ॥

অনুবাদ: বেদ ত্রৈগুণ্য (তিন গুণ— সত্ত্ব, রজ, তম) সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। হে অর্জুন, তুমি ত্রৈগুণ্যমুক্ত হও, দ্বন্দ্বরহিত হও, সর্বদা সত্ত্বগুণে স্থিত থাকো, যোগ (যা পাওয়া যায়নি তা লাভ করা) ও ক্ষেম (যা পাওয়া গেছে তা রক্ষা করা) ত্যাগ করে আত্মবান হও।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৪৬ ॥

যবানর্থ উদপানে সর্বতঃ সংপ্লতোদকে ।
তাবান্ সর্বেষু বেদেযু ব্রাহ্মণস্য় বিজানতঃ ॥

অনুবাদ: সবদিক থেকে জলপূর্ণ জলাশয়ে যে পরিমাণ প্রয়োজন থাকে, সেই প্রয়োজন জ্ঞানী ব্রাহ্মণের কাছে সমস্ত বেদে সেই পরিমাণই থাকে (অর্থাৎ, বেদের কর্মফল তাদের কাছে গৌণ)।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৪৭ ॥

কর্মণ্য়েবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন ।
মা কর্মফলহেতুর্ভূর্মা তে সঙ্গোহস্ত্বাকর্মণি ॥

অনুবাদ: কর্মেতেই তোমার অধিকার, কিন্তু কর্মফলে কখনো নয়। তুমি যেন কর্মফলের হেতু না হও এবং তোমার যেন কর্মত্যাগে আসক্তি না থাকে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৪৮ ॥

য়োগস্থঃ কুরু কর্মাণি সঙ্গং ত্যক্ত্বা ধনঞ্জয় ।
সিদ্ধ্যাসিদ্ধ্যোং সমো ভূত্বা সমত্বং যোগ উচ্যতে ॥

অনুবাদ: হে ধনঞ্জয়, আসক্তি ত্যাগ করে, সিদ্ধি ও অসিদ্ধিতে সমভাবাপন্ন হয়ে যোগে স্থিত হয়ে কর্ম করো। এই সমত্বকেই যোগ বলা হয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৪৯ ॥

দূরেণ হ্য়বরং কর্ম বুদ্ধিযোগাদ ধনঞ্জয় ।
বুদ্ধৌ শরণম্ অন্বিচ্ছ কৃপণাঃ ফলহেতবঃ ॥

অনুবাদ: হে ধনঞ্জয়, কর্মফল-সকাম কর্ম বুদ্ধিযোগ (নিষ্কাম কর্মযোগ) থেকে অত্যন্ত নিকৃষ্ট। তুমি বুদ্ধিতে (নিষ্কাম কর্মে) আশ্রয় নাও। ফলকামী ব্যক্তিরা কৃপণ।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৫০ ॥

বুদ্ধিযুক্তো জহাতীহ উভে সুকৃতদুষ্কৃতে ।
তস্মাদ্ য়োগায়় য়ুজ্য়স্ব যোগঃ কর্মসু কৌশলম্ ॥

অনুবাদ: বুদ্ধিযুক্ত (নিষ্কাম কর্মযোগী) ব্যক্তি এই জীবনেই সুকৃতি ও দুষ্কৃতি উভয়ই ত্যাগ করেন। অতএব তুমি যোগের জন্য প্রস্তুত হও। কর্মসমূহে যে কৌশল, তাই হলো যোগ।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৫১ ॥

কর্মজং বুদ্ধিযুক্তা হি ফলং ত্যক্ত্বা মনীষিণঃ ।
জন্মবন্ধবিনির্মুক্তাঃ পদং গচ্ছন্ত্য়নাময়়ম্ ॥

অনুবাদ: কারণ, বুদ্ধিযুক্ত মনীষীরা কর্মজাত ফল ত্যাগ করে জন্মরূপ বন্ধন থেকে মুক্ত হন এবং শোকহীন পরম পদ লাভ করেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৫২ ॥

যদা তে মোহকলিলং বুদ্ধির্ ব্য়তিতরিষ্য়তি ।
তদা গন্তাসি নির্বেদং শ্রোতব্য়স্য় শ্রুতস্য় চ ॥

অনুবাদ: যখন তোমার বুদ্ধি মোহরূপ জঞ্জাল অতিক্রম করবে, তখন তুমি যা শুনেছ এবং যা শুনতে হবে সে বিষয়ে বিতৃষ্ণা লাভ করবে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৫৩ ॥

শ্রুতিবিপ্রতিপন্না তে য়দা স্থাস্য়তি নিশ্চলা ।
সমাধাব অচলা বুদ্ধিস্তদা যোগমবাস্প্যসি ॥

অনুবাদ: বহু প্রকার শাস্ত্ৰীয় কথায় বিভ্রান্ত তোমার বুদ্ধি যখন নিশ্চলভাবে ও স্থিরভাবে আত্মাতে (সমাধিতে) অবস্থান করবে, তখনই তুমি যোগ লাভ করবে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৫৪ ॥

অর্জুন উবাচ ।
স্থিতপ্রজ্ঞস্য় কা ভাষা সমাধিস্থস্য় কেশব ।
স্থিতধীঃ কিং প্রভাষেত কিম্ আসীত ব্রজেত কিম্ ॥

অনুবাদ: অর্জুন বললেন: হে কেশব, সমাধিস্থ স্থিতপ্রজ্ঞ (স্থির বুদ্ধি) ব্যক্তির লক্ষণ কী? স্থির বুদ্ধি ব্যক্তি কীভাবে কথা বলেন, কীভাবে অবস্থান করেন এবং কীভাবে বিচরণ করেন?
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৫৫ ॥

শ্রীভগবান্ উবাচ ।
প্রজহাতি য়দা কামান্ সর্বান্ পার্থ মনোগতান্ ।
আত্মন্য়েবাত্মনা তুষ্টঃ স্থিতপ্রজ্ঞস্তদোচ্য়তে ॥

অনুবাদ: শ্রীভগবান্ বললেন: হে পার্থ, যখন মানুষ মনোগত সমস্ত কামনা পরিত্যাগ করে এবং আত্মাতেই নিজে সন্তুষ্ট থাকেন, তখন তিনি স্থিতপ্রজ্ঞ বলে কথিত হন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৫৬ ॥

দুঃখেষ্বনুদ্বিগ্নমনাঃ সুখেষু বিগতস্পৃহঃ ।
বীতরাগভয়়ক্রোধঃ স্থিতধীর্ মুনির উচ্য়তে ॥

অনুবাদ: দুঃখে যার মন উদ্বেগহীন, সুখে যিনি স্পৃহাহীন (আকাঙ্ক্ষাহীন), এবং রাগ, ভয় ও ক্রোধ যার থেকে চলে গেছে, সেই মুনিকে স্থিতধী (স্থিরবুদ্ধি) বলা হয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৫৭ ॥

য সর্বত্রানভিস্নেহস্তত্তত্ প্রাপ্য় শুভাশুভম্ ।
নাভিনন্দতি ন দ্বেষ্টি তস্য় প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা ॥

অনুবাদ: যিনি সর্বত্র স্নেহহীন এবং শুভ বা অশুভ যা-ই লাভ করেন, তাতে আনন্দিত হন না বা দ্বেষও করেন না, তাঁর প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত (স্থির) হয়েছে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৫৮ ॥

যদা সংহরতে চায়ং কূর্মোহঙ্গানীব সর্বশঃ ।
ইন্দ্রিয়়াণী ন্দ্রি়য়া়র্থেভ্য়স্তস্য় প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা ॥

অনুবাদ: যখন এই ব্যক্তি কচ্ছপের মতো সমস্ত দিক থেকে ইন্দ্রিয়গুলিকে ইন্দ্রিয়ের বিষয়সমূহ থেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নেন, তখন তাঁর প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত হয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৫৯ ॥

বিষয়়া বিনিবর্তন্তে নিরাহারস্য় দেহিনঃ ।
রসবর্জং রসোহপস্য পরং দৃষ্ট্বা নিবর্ততে ॥

অনুবাদ: নিরাহারী (উপবাসী) দেহীর বিষয় (ভোগের বস্তু) নিবৃত্ত হলেও তার আসক্তি (রস) থেকে যায়। কিন্তু পরম সত্যকে দেখলে তার সেই আসক্তিও নিবৃত্ত হয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৬০ ॥

যততো হ্য়পি কৌন্তেয় পুরুষস্য় বিপশ্চিতঃ ।
ইন্দ্রিয়়াণি প্রমার্থীনি হরন্তি প্রসভং মনঃ ॥

অনুবাদ: হে কুন্তীপুত্র, যত্নশীল জ্ঞানী পুরুষেরও মথনকারী ইন্দ্রিয়সমূহ জোর করে মনকে হরণ করে নেয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৬১ ॥

তানি সর্বাণি সংয়ম্য় য়ুক্ত আসীত মত্পরঃ ।
বশে হি য়স্য়েন্দ্রিয়়াণি তস্য় প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা ॥

অনুবাদ: সেই সব ইন্দ্রিয়কে সংযত করে আমাকেই পরম লক্ষ্য স্থির করে যোগী হয়ে বসতে হবে। কারণ, যার ইন্দ্রিয়গুলি বশে আছে, তার প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৬২ ॥

ধ্য়ায়়তো বিষয়়ান্ পুংসঃ সঙ্গস্তেষূপজায়়তে ।
সঙ্গাত্ সংজায়়তে কামঃ কামাত্ ক্রোধোঽভিজায়়তে ॥

অনুবাদ: বিষয়ের চিন্তা করতে থাকলে পুরুষের তাতে আসক্তি জন্মে। আসক্তি থেকে কামনা (ভোগের ইচ্ছা) উৎপন্ন হয়, আর কামনা থেকে ক্রোধ জন্ম নেয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৬৩ ॥

ক্রোধাদ্ ভবতি সম্মোহঃ সম্মোহাত্ স্মৃতিবিব্রমঃ ।
স্মৃতিভ্রংশাদ্ বুদ্ধিনাশো বুদ্ধিনাশাত্ প্রণশ্য়তি ॥

অনুবাদ: ক্রোধ থেকে সম্মোহ (বিমূঢ়তা) হয়, সম্মোহ থেকে স্মৃতির বিভ্রম হয়। স্মৃতিভ্রষ্ট হলে বুদ্ধিনাশ হয়, আর বুদ্ধিনাশ হলে মানুষ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৬৪ ॥

রাগদ্বেষবিমুক্তৈস্তু বিষয়়ান্ ইন্দ্রিয়়ৈশ্চরন্ ।
আত্মবশ্য়ৈর্ বিধেয়়াত্মা প্রসাদম অধিগচ্ছতি ॥

অনুবাদ: কিন্তু যিনি রাগ-দ্বেষ থেকে মুক্ত এবং সংযতচিত্ত হয়ে, বশীভূত ইন্দ্রিয় দ্বারা বিষয়সমূহ উপভোগ করেন, তিনি প্রসন্নতা লাভ করেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৬৫ ॥

প্রসাদে সর্বদুঃখানাং হানির অস্য়োপজায়়তে ।
প্রসন্নচেতসো হ্য়াশু বুদ্ধিঃ পর্য়বতিষ্ঠতে ॥

অনুবাদ: প্রসন্নতা লাভ হলে তার সমস্ত দুঃখের বিনাশ হয়। কারণ, প্রসন্নচিত্ত ব্যক্তির বুদ্ধি শীঘ্রই সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৬৬ ॥

নাস্তি বুদ্ধির অয়ুক্তস্য় ন চায়ুক্তস্য় ভাবনা ।
ন চাভাবয়়তঃ শান্তির্ অশান্তস্য় কুতঃ সুখম্ ॥

অনুবাদ: অসংযত ব্যক্তির বুদ্ধি হয় না, এবং অসংযত ব্যক্তির কোনো ভাবন (আত্মজ্ঞান) থাকে না। ভাবনাহীন ব্যক্তির শান্তি হয় না, আর শান্তিশূন্য ব্যক্তির সুখ কোথা থেকে হবে?
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৬৭ ॥

ইন্দ্রিয়াণাং হি চরতাং যন্মনোহনুবিধীয়তে ।
তদ অস্য় হরতি প্রজ্ঞাং বায়ুর্ নাবম ইবাম্ভসি ॥

অনুবাদ: ইন্দ্রিয়সমূহ যখন বিষয়ে বিচরণ করে, তখন মন যদি তাদের অনুগামী হয়, তবে সেই মন তার প্রজ্ঞাকে এমনভাবে হরণ করে, যেমন জলমধ্যে বাতাস একটি নৌকাকে হরণ করে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৬৮ ॥

তস্মাদ্ য়স্য় মহাবাহো নিগৃহীতানি সর্বশঃ ।
ইন্দ্রিয়়াণী ন্দ্রিয়়ার্থ্ভ্য়স্তস্য় প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা ॥

অনুবাদ: অতএব, হে মহাবাহু, যার ইন্দ্রিয়গুলি সমস্ত দিক থেকে ইন্দ্রিয়ের বিষয়সমূহ থেকে সম্পূর্ণ নিগৃহীত (সংযত), তাঁর প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৬৯ ॥

যা নিশা সর্বভূতানাং তস্যাং জাগর্তি সংযমী ।
যস্যাং জাগ্রতি ভূতানি সা নিশা পশ্য়তো মুনেঃ ॥

অনুবাদ: সমস্ত প্রাণীর কাছে যা রাত, সংযমী ব্যক্তি তাতে জেগে থাকেন। আর যে বিষয়ে প্রাণীরা জেগে থাকে, সত্যদর্শী মুনির কাছে তা রাত।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৭০ ॥

আপূর্য়মাণম অচলপ্রতিষ্ঠম্
সমুদ্রম আপঃ প্রবিশন্তি য়দ্বত্ ।
তদ্বত্ কামা য়ং প্রবিশন্তি সর্বে
স শান্তি ম্ আপ্নোতি ন কামকামী ॥

অনুবাদ: যেমন নানা নদী থেকে জল প্রবেশ করলেও সমুদ্র সর্বদা পূর্ণ ও অচঞ্চল থাকে, তেমনই সমস্ত কামনা যাঁর মধ্যে প্রবেশ করলেও যিনি অচঞ্চল থাকেন, তিনিই শান্তি লাভ করেন, ভোগকামী ব্যক্তি নয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৭১ ॥

বিহায়় কামান্ যঃ সর্বান্ পুমাংশ্চরতি নিস্পৃহঃ ।
নির্মমো নিরহঙ্কারঃ স শান্তি ম অধিগচ্ছতি ॥

অনুবাদ: যে পুরুষ সমস্ত কামনা ত্যাগ করে, স্পৃহাহীন (আকাঙ্ক্ষাহীন), মমত্ববোধহীন ও অহংকারহীন হয়ে বিচরণ করেন, তিনিই শান্তি লাভ করেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ২.৭২ ॥

এষা ব্রাহ্মী স্থিতিঃ পার্থ নৈনাং প্রাপ্প্য় বিমুহ্য়তি ।
স্থিত্বাঽস্য়াম অন্তকালেঽপি ব্রহ্মনির্বাণম ঋচ্ছতি ॥

অনুবাদ: হে পার্থ, এটিই হলো ব্রাহ্মী স্থিতি (ব্রহ্মের সঙ্গে একাত্মতার অবস্থা)। এই অবস্থা লাভ করে আর কেউ মোহগ্রস্ত হয় না। জীবনের শেষ সময়েও এই স্থিতিতে স্থিত থাকলে ব্রহ্মনির্বাণ (পরম মুক্তি) লাভ করা যায়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ ইতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসু উপনিষত্সু ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে সাংখ্যযোগ নাম দ্বিতীয়ঽধ্যায়ঃ ॥

এইভাবে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা উপনিষদের ব্রহ্মবিদ্যা এবং যোগশাস্ত্রের অন্তর্গত শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের সংবাদে 'সাংখ্যযোগ' নামক দ্বিতীয় অধ্যায় সমাপ্ত হলো।