॥ অধ্যায় ২, শ্লোক ৫২ ॥

য়দা তে মোহকলিলং বুদ্ধির্ব্যতিতরিষ্যতি ।
তদা গন্তাসি নির্বেদং শ্রোতব্যস্য শ্রুতস্য চ ॥ ৫২ ॥

সরল ভাবার্থ

যখন তোমার বুদ্ধি মোহেরূপ দুর্গম অরণ্য বা পঙ্কিলতা অতিক্রম করবে, তখন তুমি যা শুনেছ এবং যা শুনবে—সেই সব বিষয়ের প্রতি নির্বেদ বা বৈরাগ্য লাভ করবে।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

শ্রীকৃষ্ণ এখানে বুদ্ধির শুদ্ধিকরণের কথা বলছেন। তিনি মোহকে 'কলিলং' বা গভীর অরণ্য/পঙ্কিলতার সাথে তুলনা করেছেন। মোহ হলো সেই অন্ধকার যা আমাদের সত্য দেখতে বাধা দেয়। অর্জুন তাঁর আত্মীয়স্বজনের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তির কারণে মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন যে, যখন তোমার বুদ্ধি এই মোহের পর্দা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে, তখন তুমি এক অদ্ভুত মানসিক অবস্থা লাভ করবে—যাকে বলা হয় 'নিৰ্বেদ'। নির্বেদ মানে হলো জাগতিক শাস্ত্র বা প্রলোভনমূলক বাণীর প্রতি এক ধরণের উদাসীনতা।

এই শ্লোকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এটি বেদের সেই অংশগুলোর প্রতি অনাসক্তির কথা বলে যা কেবল স্বর্গ ও ভোগের কথা শোনায়। মানুষ সাধারণত যা শোনে (শ্রুতস্য) এবং যা শোনার পরিকল্পনা করে (শ্রোতব্যস্য), তা বেশিরভাগই তার কামনা বাসনাকে বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু যখন আত্মজ্ঞান জাগ্রত হয়, তখন এইসব বাহ্যিক তথ্যের আর প্রয়োজন থাকে না। মোহমুক্ত বুদ্ধিতে তখন কেবল পরমাত্মার জ্যোতি প্রতিফলিত হয়।

ধর্মীয় বিচারে, এটি হলো সত্যের সরাসরি উপলব্ধি। অর্জুন যখন বুঝতে পারবেন যে তিনি দেহ নন, আত্মা; তখন পিতামহ বা আচার্যের মৃত্যুর শোক তাঁকে আর স্পর্শ করবে না। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, প্রকৃত আধ্যাত্মিকতা আসে অনুভবের মাধ্যমে, কেবল পুঁথিগত বিদ্যা বা শ্রুতির মাধ্যমে নয়। যখন মানুষের মন পরিষ্কার হয়, তখন সে বুঝতে পারে যে জাগতিক লাভ-ক্ষতির কথাগুলো কতটা তুচ্ছ। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে সেই পরম মুক্তির স্তরের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন যেখানে সমস্ত জাগতিক কোলাহল শান্ত হয়ে যায়।