সরল ভাবার্থ
নানা প্রকার শাস্ত্রবাক্য শুনে বিচলিত তোমার বুদ্ধি যখন পরমাত্মায় অচঞ্চল ও স্থিরভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে, তখনই তুমি পরম যোগ লাভ করবে।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
শ্রীকৃষ্ণ এখানে অর্জুনের মানসিক দ্বিধার মূল কারণটি চিহ্নিত করেছেন। অর্জুন নানা মুনির নানা মত এবং বিভিন্ন শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা শুনে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিলেন। একেই বলা হয়েছে 'শ্রুতিবিপ্রতিপন্না'। আমাদের চারপাশের জগত এবং শাস্ত্রীয় বিধান অনেক সময় আমাদের বিভ্রান্ত করে—কোনটি ধর্ম আর কোনটি অধর্ম তা বুঝতে বাধা দেয়। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, যখন তোমার বুদ্ধি এইসব মতভেদের ঊর্ধ্বে উঠে 'নিশ্চলা' বা স্থির হবে, তখনই তুমি যোগের প্রকৃত স্বাদ পাবে।
'সমাধাবচলা বুদ্ধি'—সমাধি মানে কেবল চোখ বুজে বসে থাকা নয়, বরং বুদ্ধিকে পরমাত্মার সাথে একীভূত করা। যখন বুদ্ধি কোনো অবস্থাতেই বিচলিত হয় না, তখন তাকে অচল বুদ্ধি বলা হয়। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন যে, তোমার কাজ হলো এই পরম স্থিরতা অর্জন করা। রণাঙ্গনের মাঝখানে দাঁড়িয়েও যদি তোমার মন ভগবানে স্থির থাকে, তবেই তুমি প্রকৃত যোগী।
ধর্মীয় বিচারে, এটি সত্য উপলব্ধির চূড়ান্ত পর্যায়। শাস্ত্রের প্রয়োজন কেবল সত্যের দ্বারে পৌঁছানো পর্যন্ত। যখন কেউ সত্যকে চিনে ফেলে, তখন শাস্ত্রের বিচিত্র কথা তাকে আর বিভ্রান্ত করতে পারে না। অর্জুন যে পাণ্ডিত্যের দোহাই দিয়ে যুদ্ধ থেকে সরতে চাইছিলেন, কৃষ্ণ তাকে বোঝাচ্ছেন যে সেই পাণ্ডিত্য আসলে তার বুদ্ধিকে অস্থির করে দিচ্ছে। প্রকৃত যোগ হলো মনের প্রশান্তি ও স্থিতধী অবস্থা। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, সত্যের সন্ধানে বাইরের কোলাহল ছেড়ে নিজের অন্তরের পরমাত্মার দিকে তাকাতে হয়। যখন বুদ্ধি সেখানে স্থির হয়, তখনই মানুষের জীবন সার্থক হয়।