সরল ভাবার্থ
শ্রীভগবান বললেন—হে পার্থ! যখন মানুষ মনের সমস্ত কামনা-বাসনা সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করে এবং নিজের আত্মার দ্বারাই নিজের আত্মাতে তুষ্ট থাকেন, তখনই তাকে স্থিতপ্রজ্ঞ বলা হয়।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
এটি স্থিতপ্রজ্ঞের প্রধান এবং প্রথম লক্ষণ। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন যে, সুখের চাবিকাঠি বাইরের কোনো বস্তুতে নয়, বরং নিজের ভেতরে। সাধারণ মানুষ সুখের জন্য অন্যের ওপর বা বাইরের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। কিন্তু স্থিতপ্রজ্ঞ মানুষ 'আত্মন্যেবাত্মনা তুষ্টঃ'—অর্থাৎ তিনি নিজের ভেতরেই আনন্দ খুঁজে পান। তাঁর এই আনন্দ কারো দেওয়া বা নেওয়া নয়। তিনি যখন বুঝতে পারেন যে আত্মা নিজেই পূর্ণ ও আনন্দময়, তখন জাগতিক সমস্ত কামনা (কামান্ সর্বান্) তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।
এই শ্লোকটি আমাদের মনের গঠনের ওপর আলোকপাত করে। কামনাই হলো দুঃখের মূল। কামনা মানেই হলো অভাববোধ। কিন্তু আত্মজ্ঞানী ব্যক্তি জানেন যে তাঁর কোনো কিছুরই অভাব নেই। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে 'পার্থ' বলে সম্বোধন করেছেন এবং তাঁকে এই স্তরে পৌঁছাতে উৎসাহিত করছেন। কামনা ত্যাগ করা মানে জোর করে কিছু ছেড়ে দেওয়া নয়, বরং উচ্চতর আনন্দের স্বাদ পেয়ে নিম্নতর আনন্দ থেকে আপনাআপনি সরে আসা।
ধর্মীয় বিচারে, এটি হলো পূর্ণত্বের অবস্থা। যখন মনের মধ্যে কোনো চাওয়া থাকে না, তখন মন শান্ত হয়। এই শান্তিই হলো বুদ্ধির স্থিরতা। অর্জুনের যুদ্ধক্ষেত্রে শোক আসছিল কারণ তাঁর মনে কিছু বিশেষ ফল পাওয়ার কামনা ছিল। শ্রীকৃষ্ণ তাকে বোঝাচ্ছেন যে, ফলের আশা ছেড়ে নিজের অস্তিত্বে তৃপ্ত হতে শিখলে জগতকে জয় করা সম্ভব। এই শ্লোকটি আজ আমাদের শেখায় যে, আধুনিক জীবনের এই ইঁদুর দৌড় থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের নিজের অন্তরের দিকে তাকাতে হবে। প্রকৃত তৃপ্তি বাইরের কেনাকাটায় বা খ্যাতিতে নেই, তা আছে নিজের শুদ্ধ চৈতন্যের উপলব্ধিতে।