সরল ভাবার্থ
দুঃখে যাঁর মন বিচলিত হয় না, সুখে যাঁর কোনো স্পৃহা নেই এবং যাঁর আসক্তি, ভয় ও ক্রোধ দূরীভূত হয়েছে—তাঁকেই স্থিতপ্রজ্ঞ মুনি বলা হয়।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
শ্রীকৃষ্ণ এখানে স্থিতপ্রজ্ঞের মানসিক ভারসাম্যের কথা বলছেন। আমরা সাধারণত দুঃখে ভেঙে পড়ি আর সুখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাই। কিন্তু স্থিতপ্রজ্ঞ মানুষ এই দুইয়েরই ঊর্ধ্বে। 'দুঃখেষ্বনুদ্বিগ্নমনাঃ'—অর্থাৎ চরম দুঃখের সময়েও তাঁর মন শান্ত থাকে, কারণ তিনি জানেন এটি ক্ষণস্থায়ী এবং দেহের ধর্ম। আবার সুখের সময়েও তিনি 'বিগতস্পৃহ' বা নির্লিপ্ত থাকেন, কারণ তিনি সুখের পেছনে ছুটে বেড়ান না।
এই শ্লোকটিতে তিনটি প্রধান শত্রুর কথা বলা হয়েছে—রাগ (আসক্তি), ভয় এবং ক্রোধ। যার জীবন থেকে এই তিনটি চিরতরে চলে গেছে, তিনিই প্রকৃত মুনি। আসক্তি থাকলে ভয় আসে (সেটি হারানোর ভয়), আর যখন আসক্তিতে বাধা পড়ে তখন ক্রোধ তৈরি হয়। স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি এই দুষ্টচক্র থেকে মুক্ত। তিনি জগতের ঘটনাগুলোকে সাক্ষী হিসেবে দেখেন।
ধর্মীয় বিচারে, এটি হলো মনের এক পরম স্থিতিশীলতা। অর্জুনকে শ্রীকৃষ্ণ এটি বলছেন কারণ যুদ্ধে যেমন জয়ের সম্ভাবনা আছে, তেমনি পরাজয় বা প্রিয়জন হারানোর ভয়ও আছে। অর্জুন যদি এই স্থিতধী অবস্থা অর্জন করতে পারেন, তবে কোনো পরিস্থিতিই তাঁকে দুর্বল করতে পারবে না। এই শিক্ষা আমাদের শেখায় যে, জীবনের চড়াই-উতরাই থাকবেই, কিন্তু আমাদের নৌকা যেন তাতে ডুবে না যায়। মনের হালের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখা এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে শান্ত থাকাই হলো প্রকৃত আধ্যাত্মিক সাধনা। এই শ্লোকটি আমাদের সংবেদনশীলতাকে নষ্ট করতে বলে না, বরং আমাদের আবেগগুলোকে নিয়ন্ত্রণের এক মহৎ পথ দেখায়।