॥ অধ্যায় ২, শ্লোক ৫৭ ॥

যঃ সর্বত্রানভিস্নেহস্তত্তৎ প্রাপ্য শুভাশুভম্ ।
নাভিনন্দতি ন দ্বেষ্টি তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা ॥ ২.৫৭ ॥

সরল ভাবার্থ

যিনি সব অবস্থাতেই আসক্তিহীন এবং শুভ বা অশুভ যা-ই প্রাপ্ত হন না কেন, তাতে আনন্দিত হন না কিংবা দ্বেষ করেন না, তাঁর প্রজ্ঞা স্থির বা সুপ্রতিষ্ঠিত।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

শ্রীকৃষ্ণ এখানে 'অনভিস্নেহ' বা বিশেষ স্নেহহীনতার কথা বলছেন। এর অর্থ এই নয় যে মানুষ নিষ্ঠুর হবে। এর অর্থ হলো আসক্তিমুক্ত ভালোবাসা। আমরা সাধারণত কোনো ভালো খবর পেলে আনন্দে লাফিয়ে উঠি এবং খারাপ খবর পেলে হতাশায় ভেঙে পড়ি। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ বলছেন যে, স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি শুভ প্রাপ্তিতে 'নাভিনন্দতি' (উচ্ছ্বসিত হন না) এবং অশুভ প্রাপ্তিতে 'ন দ্বেষ্টি' (ঘৃণা বা দুঃখ প্রকাশ করেন না)। তিনি জানেন যে শুভ এবং অশুভ হলো জীবনের মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ।

এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, পরিবেশের দাস হওয়া উচিত নয়। আমাদের সুখ যদি বাইরের ঘটনার ওপর নির্ভর করে, তবে আমরা কোনোদিন স্থায়ী শান্তি পাব না। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন যে, যদি যুদ্ধে জয় আসে তবে তা যেন তাঁকে অহংকারী না করে, আর যদি মৃত্যু বা পরাজয় আসে তবে তা যেন তাঁকে দুর্বল না করে। প্রজ্ঞা তখনই সুপ্রতিষ্ঠিত হয় যখন মন এই দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে উঠতে পারে।

ধর্মীয় বিচারে, এটি হলো আত্মসমর্পণের এক উচ্চতর অবস্থা। যখন কেউ মনে করে যে যা-ই ঘটছে তা ঈশ্বরের ইচ্ছা বা প্রকৃতির নিয়ম, তখন সে শান্ত থাকে। অর্জুনের দ্বিধা ছিল এই 'শুভাশুভ' নিয়ে—তিনি মনে করছিলেন স্বজন হত্যা অশুভ। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ তাকে শেখাচ্ছেন যে কর্তব্যের পথে শুভ-অশুভর ঊর্ধ্বে তাকাতে হয়। আমাদের প্রজ্ঞা তখনই টলমল করে যখন আমরা নিজের পছন্দমতো ফল পেতে চাই। এই শ্লোকটি আধুনিক যুগের মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি আমাদের যেকোনো পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেওয়ার মানসিক শক্তি দেয়। যখন আমরা ভালো-মন্দ দুইকেই প্রসাদের মতো গ্রহণ করতে শিখি, তখনই আমরা প্রকৃত মুক্তি লাভ করি।