সরল ভাবার্থ
কচ্ছপ যেমন তার অঙ্গসমূহ নিজের শরীরের ভেতরে গুটিয়ে নেয়, তেমনি যখন কোনো ব্যক্তি তাঁর ইন্দ্রিয়গুলোকে ইন্দ্রিয়ের বিষয় থেকে সম্পূর্ণভাবে গুটিয়ে নিতে পারেন, তাঁর প্রজ্ঞা তখন স্থির হয়।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
শ্রীকৃষ্ণ এখানে কচ্ছপের একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী উদাহরণ ব্যবহার করেছেন। কচ্ছপ যখন কোনো বিপদ দেখে বা প্রয়োজন মনে করে, তখন সে তার মাথা ও হাত-পা শক্ত খোলসের ভেতরে লুকিয়ে ফেলে। ঠিক তেমনি, একজন স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি তাঁর ইন্দ্রিয়গুলোকে (চোখ, কান, জিহ্বা ইত্যাদি) বাইরের প্রলোভন বা বিষয় থেকে সরিয়ে নিতে সক্ষম হন। এর অর্থ এই নয় যে তিনি জগত থেকে পালিয়ে যান। এর অর্থ হলো ইন্দ্রিয়ের ওপর তাঁর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে।
সাধারণত আমাদের ইন্দ্রিয়গুলো বাইরের বিষয়ের পেছনে পাগলা ঘোড়ার মতো ছোটে। আমাদের চোখ যা দেখে তাতে আসক্ত হয়, কান যা শোনে তাতেই মন বিচলিত হয়। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ বলছেন যে, প্রজ্ঞা তখনই স্থির হয় যখন আমরা এই ঘোড়াগুলোর লাগাম নিজেদের হাতে রাখি। এটি হলো এক ধরণের মানসিক শক্তির পরীক্ষা। কচ্ছপের উদাহরণটি নিখুঁত কারণ কচ্ছপ তার অঙ্গগুলো ছিঁড়ে ফেলে না, কেবল গুটিয়ে নেয়। স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তিও জগতে বাস করেন, কিন্তু জগতের আবিলতা তাঁকে স্পর্শ করে না।
ধর্মীয় বিচারে, এটি হলো 'প্রত্যাহার' নামক যোগের এক ধাপ। যখন অর্জুন যুদ্ধক্ষেত্রে অনেক কিছু দেখবেন—মরণ-চিৎকার, রক্তপাত বা প্রিয়জনদের মুখ—তখন তাঁর ইন্দ্রিয়গুলো তাঁকে বিচলিত করতে পারে। শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে বলছেন কচ্ছপের মতো অন্তর্মুখী হতে। বাইরের উত্তাল তরঙ্গের মাঝেও যেন তাঁর অন্তরের কেন্দ্রটি অটুট থাকে। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, সংযমই হলো বুদ্ধির রক্ষাকবচ। যারা ইন্দ্রিয়ের দাসে পরিণত হয়, তারা সত্য থেকে দূরে সরে যায়। কিন্তু যারা ইন্দ্রিয়ের অধিপতি হন, তাঁরাই অমৃত লাভ করেন।