সরল ভাবার্থ
উপবাস বা নিরাহার থাকলে শরীরী মানুষের ইন্দ্রিয়ের বিষয়গুলো নিবৃত্ত হয় ঠিকই, কিন্তু সেই বিষয়ের প্রতি আসক্তি বা 'রস' থেকে যায়। তবে পরমাত্মার দর্শন লাভ করলে সেই সূক্ষ্ম আসক্তিও দূর হয়ে যায়।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
শ্রীকৃষ্ণ এখানে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম মনোবৈজ্ঞানিক সত্য তুলে ধরেছেন। মানুষ যখন জোর করে ইন্দ্রিয় দমন করে (যেমন উপবাস করা বা কোনো খাবার বর্জন করা), তখন হয়তো সে সাময়িকভাবে সেই কাজ থেকে বিরত থাকে, কিন্তু তার মনের ভেতরে সেই জিনিসের প্রতি আকাঙ্ক্ষা বা 'রস' থেকে যায়। এটি হলো এক ধরণের কৃত্রিম সংযম। ডায়েট করার সময় যেমন মিষ্টির কথা বেশি মনে পড়ে, ঠিক তেমনি জোরপূর্বক নিগ্রহ করলে আসক্তি আরও বেড়ে যায়।
কিন্তু সমাধান কোথায়? শ্রীকৃষ্ণ বলছেন—'পরং দৃষ্ট্বা নিবর্ততে'। যখন কোনো ব্যক্তি উচ্চতর কোনো আনন্দের (পরমাত্মার) স্বাদ পায়, তখন নিম্নতর জাগতিক আসক্তি আপনাআপনি খসে পড়ে। একে বলা হয় 'পজিটিভ সাবস্টিটিউশন'। এক বালতি ঘোলা জলের মধ্যে যদি অনবরত পরিষ্কার জল ঢালা হয়, তবে একসময় ঘোলা জল উপচে পড়ে কেবল পরিষ্কার জলই বাকি থাকবে। আত্মজ্ঞান বা ভক্তি হলো সেই স্বচ্ছ জল যা মনের ভেতরের বিষয়ের প্রতি সূক্ষ্ম লালসাকে ধুয়ে ফেলে।
ধর্মীয় বিচারে, এটি হলো প্রকৃত ব্রহ্মচর্যের রহস্য। এটি কেবল কৃচ্ছ্রসাধন নয়, বরং আনন্দের উত্তরণ। অর্জুনকে শ্রীকৃষ্ণ এটি বোঝাচ্ছেন কারণ কেবল অস্ত্রের জোরে যুদ্ধ জেতা যায় না, মনকে উচ্চতর আধ্যাত্মিক লক্ষ্য বা ঈশ্বরের চরণে যুক্ত করতে হয়। যখন মানুষ ভগবানের প্রেমের স্বাদ পায়, তখন জাগতিক তুচ্ছ সুখ তাঁর কাছে বিস্বাদ মনে হয়। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, কুপ্রবৃত্তি দূর করার শ্রেষ্ঠ উপায় হলো সুপ্রবৃত্তিতে মগ্ন হওয়া। জোর করে সংযম করলে হয়তো শরীরের রোগ সারে, কিন্তু পরমাত্মার আনন্দই পারে মনের রোগ অর্থাৎ আসক্তি নির্মূল করতে।
[Image showing a bright sun (Paramatma) making small candlelight flames (worldly desires) fade away]