॥ অধ্যায় ২, শ্লোক ৫০ ॥

বুদ্ধিয়ুক্তো জহাতীহ উভে সুকৃতদুষ্কৃতে ।
তস্মাদ্যোগায় য়ুজ্যস্ব যোগঃ কর্মসু কৌশলম্ ॥ ৫০ ॥

সরল ভাবার্থ

যিনি বুদ্ধিযুক্ত (নিষ্কাম কর্মযোগী), তিনি এই জীবনেই পুণ্য এবং পাপ উভয়কেই ত্যাগ করতে পারেন। অতএব, তুমি যোগে যুক্ত হও; কারণ কর্মের কুশলতাই হলো যোগ।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

এটি হলো গীতার অন্যতম একটি বৈপ্লবিক শ্লোক যেখানে বলা হয়েছে—'যোগঃ কর্মসু কৌশলম্'। অর্থাৎ কর্ম করার নিপুণ কৌশলই হলো যোগ। সাধারণ মানুষ কাজ করে কর্মবন্ধনে আবদ্ধ হয়, কিন্তু যোগী সেই একই কাজ করেন এমন কৌশলে যে তিনি মুক্ত হয়ে যান। এই কৌশলটি কী? কৌশলটি হলো ফলের আসক্তি ত্যাগ করা। যিনি বুদ্ধিযুক্ত, তিনি জানেন যে ভালো কাজ (সুকৃত) যেমন মানুষকে স্বর্গের সোনার শিকলে বাঁধে, তেমনি খারাপ কাজ (দুষ্কৃত) মানুষকে লোহার শিকলে বাঁধে। কিন্তু একজন নিষ্কাম কর্মযোগী উভয়কেই ত্যাগ করে পরম শান্তিতে পৌঁছান।

শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন যে, তুমি যদি কর্মফলের মায়া ত্যাগ করে কাজ করো, তবে যুদ্ধের মতো ঘোর হিংসাত্মক কাজে লিপ্ত হয়েও তোমাকে কোনো পাপ স্পর্শ করবে না। এটিই হলো যোগের কেরামতি। যোগ মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়, বরং জগতের সমস্ত কাজ অত্যন্ত নিপুণভাবে করা কিন্তু তার সাথে মানসিকভাবে জড়িয়ে না পড়া।

ধর্মীয় বিচারে, এটি আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের জন্য প্রযোজ্য। আমরা যা-ই করি না কেন—পড়াশোনা, চাকরি বা সংসার—তা যদি আমরা দক্ষতার সাথে করি এবং ফলের চিন্তা ভগবানে সমর্পণ করি, তবে সেটাই হবে আমাদের সাধনা। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে একজন দক্ষ যোদ্ধা হতে বলছেন, কিন্তু সেই দক্ষতা হতে হবে আসক্তিহীন। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, আধ্যাত্মিকতা মানে কর্মবিমুখতা নয়, বরং কর্মের মধ্যে এক দিব্য কুশলতা অর্জন করা। যে মানুষ এই কৌশল জানে, সে এই উত্তাল জগতের ঢেউয়ের ওপর দিয়ে অবলীলায় হেঁটে যেতে পারে। এই পরম যোগের পথেই অর্জুনকে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন পরমেশ্বর।
[ছবি: অর্জুন তাঁর গাণ্ডীব নিয়ে নিপুণভাবে লক্ষ্যভেদের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন কিন্তু তাঁর মনে এক অলৌকিক স্থিরতা বিরাজ করছে।]