সরল ভাবার্থ
নিষ্কাম কর্মযোগী পণ্ডিতগণ কর্মজনিত ফল ত্যাগ করে জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্ত হন এবং পরম পদ বা নির্বাণ লাভ করেন, যা সমস্ত প্রকার দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্ত।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
শ্রীকৃষ্ণ এখানে 'মনীষিণঃ' বা প্রকৃত জ্ঞানীদের লক্ষ্যের কথা বলছেন। একজন সাধারণ মানুষ এবং একজন মনীষীর মধ্যে পার্থক্য হলো ফলের প্রতি আসক্তি। সাধারণ মানুষ প্রতিটি কাজের পেছনে একটি বিনিময় মূল্য খোঁজে, যার ফলে সে কর্মফলের জালে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু যারা বুদ্ধিযুক্ত বা নিষ্কাম কর্মযোগী, তারা জানেন যে কর্মফলই হলো পুনর্জন্মের মূল কারণ। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, যখন কোনো ব্যক্তি ফলের আশা ত্যাগ করে কেবল ভগবানের সন্তুষ্টির জন্য কাজ করেন, তখন তাঁর কর্ম আর বন্ধন তৈরি করে না।
এই শ্লোকটি আমাদের 'অনাময়ম্' পদের কথা বলে। অনাময় মানে যেখানে কোনো রোগ বা শোক নেই, অর্থাৎ পরমেশ্বরের ধাম। হিন্দু দর্শনে জন্ম-মৃত্যুর এই চক্রকে একটি রোগ হিসেবে দেখা হয়। এই রোগ থেকে মুক্তির একমাত্র ঔষধ হলো নিষ্কাম কর্ম। অর্জুন যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে শোক করছিলেন কারণ তিনি যুদ্ধের ফলাফলের সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ তাকে বোঝাচ্ছেন যে, ফলের চিন্তা ছেড়ে যদি তিনি তাঁর ধর্ম পালন করেন, তবে তিনি কেবল এই যুদ্ধই জয় করবেন না, বরং জীবনের পরম লক্ষ্য মোক্ষ লাভ করবেন।
ধর্মীয় বিচারে, এটি হলো ত্যাগের পরাকাষ্ঠা। ত্যাগ মানে কাজ ছেড়ে দেওয়া নয়, বরং কাজের ভেতরের 'আমি' ভাব এবং 'পাওয়ার' ইচ্ছা ত্যাগ করা। যখন আমরা এই স্তরে পৌঁছাই, তখন আমাদের প্রতিটি কাজ প্রার্থনায় পরিণত হয়। মনীষীরা এই পথেই পরম শান্তি খুঁজে পান। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে সেই মনীষীদের কাতারে সামিল হতে আহ্বান জানাচ্ছেন। এটি আমাদের শেখায় যে, জীবনের উদ্দেশ্য কেবল ভোগ করা নয়, বরং আসক্তিহীন হয়ে কর্মের মাধ্যমে মুক্তি অর্জন করা।