॥ অধ্যায় ২, শ্লোক ৩৫ ॥

ভয়াদ্রণাদুপরতং মংস্যন্তে ত্বাং মহারথাঃ ।
য়েষাং চ ত্বং বহুমতো ভূত্বা য়াস্যসি লাঘবম্ ॥ ৩৫ ॥

সরল ভাবার্থ

মহারথীরা মনে করবেন যে তুমি ভয়ের কারণেই যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত হয়েছ; যাঁদের কাছে তুমি অতি সম্মানীয় ছিলে, তাঁদের কাছে তুমি অত্যন্ত তুচ্ছ হয়ে পড়বে।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

এই শ্লোকটি অর্জুনের বীরত্বের ওপর এক চূড়ান্ত চপেটাঘাত। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে রূঢ় বাস্তব দেখাচ্ছেন। তিনি বলছেন, দুর্যোধন বা কর্ণের মতো 'মহারথী'রা কোনোদিন বিশ্বাস করবে না যে তুমি করুণার কারণে যুদ্ধ ছেড়েছ। তারা হাসাহাসি করবে এবং ভাববে যে অর্জুন আসলে কর্ণের বা পিতামহ ভীষ্মের ভয়ে কাঁপছে। যারা তোমাকে দেবরাজ ইন্দ্রের সমান বীর মনে করত, তারা তোমাকে চরম তুচ্ছজ্ঞান করবে।

ধর্মীয় বিচারে, শ্রীকৃষ্ণ এখানে অর্জুনকে 'লাঘবম্' বা লঘু হয়ে যাওয়ার কথা বলছেন। একজন মহাপুরুষ যখন তাঁর নীতি থেকে সরে যান, তখন তিনি সবার কাছে হাসির পাত্র হন। অর্জুনের দয়া কেবল তাঁর মনে আছে, কিন্তু বহির্জগত তাঁর এই কাজকে কাপুরুষতা হিসেবেই বিচার করবে। শ্রীকৃষ্ণ চাইছেন অর্জুনের ক্ষত্রিয় তেজোদীপ্ত চেতনা ফিরে আসুক।

এই শ্লোকটি আমাদের একটি বড় জীবন দর্শন দেয়—আমরা অনেক সময় মনে করি আমরা খুব মহান কিছু করছি, কিন্তু যদি তা আমাদের কর্তব্যের পরিপন্থী হয়, তবে জগত আমাদের ভুল বুঝবেই। অর্জুনের দায়িত্ব হলো যুদ্ধ করা। যদি তিনি তা না করেন, তবে তাঁর পূর্বের সব বীরত্ব ম্লান হয়ে যাবে। শত্রু পক্ষের সামনে অর্জুনের এই দুর্বলতা প্রকাশ পেলে তা পাণ্ডবদের পরাজয়কেও ত্বরান্বিত করবে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে এটা বোঝাতে চাইছেন যে, তাঁর একটি ভুল সিদ্ধান্ত কেবল তাঁকে নয়, বরং পুরো পাণ্ডব পক্ষের সম্মানকে ধ্বংস করে দেবে। এই 'লাঘবম্' বা মর্যাদাহানি একজন প্রকৃত যোদ্ধার কাছে বিষের মতো।
[ছবি: কৌরব শিবিরের মহারথীরা (কর্ণ, দুর্যোধন) হাসাহাসি করছেন এবং অর্জুনের দিকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকাচ্ছেন।]