॥ অধ্যায় ২, শ্লোক ৩৬ ॥

অবাচ্যবাদাংশ্চ বহুন্ বদিষ্যন্তি তবাহিতাঃ ।
নিন্দন্তস্তব সামর্থ্যং ততো দুঃখতরং নু কিম্ ॥ ৩৬ ॥

সরল ভাবার্থ

তোমার শত্রুরা তোমার সামর্থ্য নিন্দা করে অনেক কটু কথা বলবে; তার চেয়ে অধিক দুঃখের বিষয় আর কী হতে পারে?

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

শ্রীকৃষ্ণ এখানে কটু বাক্যের যন্ত্রণার কথা বলছেন। তিনি বলছেন, তোমার শত্রুরা (অহিতগণ) তোমার বীরত্বের উপহাস করে এমন সব কথা বলবে যা কানে শোনাও দায়। তারা বলবে অর্জুন কোনো বীরই নয়, সে কেবল ফাঁকা আওয়াজ করে। তারা তোমার অসীম সামর্থ্যের নিন্দা করবে। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে প্রশ্ন করছেন—একজন বীরের কাছে তাঁর শক্তির অবমাননার চেয়ে বড় দুঃখ আর কী হতে পারে?

এই শ্লোকটি মানুষের অহং এবং আত্মসম্মানকে নাড়া দেওয়ার জন্য। শ্রীকৃষ্ণ এখানে পার্থিব যুক্তির চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছেছেন। তিনি জানেন যে অর্জুন এখনও পুরোপুরি আধ্যাত্মিক হননি, তাই তাঁকে সামাজিক ও বীরত্বপূর্ণ যুক্তি দিয়ে জাগাতে হবে। শত্রুর বিদ্রূপ সহ্য করা একজন তেজস্বী পুরুষের পক্ষে অসম্ভব। অর্জুন যে কর্ণের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন, সেই কর্ণ যদি তাঁকে বিদ্রূপ করেন, তবে অর্জুনের সারা জীবনের সাধনা বৃথা হয়ে যাবে।

ধর্মীয় তত্ত্বে বলা হয় যে, মানুষের জিহ্বা তলোয়ারের চেয়েও ধারালো। শত্রুর মিথ্যা অপবাদ এবং উপহাস মানুষকে ভেতর থেকে দগ্ধ করে। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন, তুমি এই যুদ্ধের বিভীষিকা এড়াতে গিয়ে এমন এক চিরস্থায়ী দুঃখের দিকে পা বাড়াচ্ছো যা মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, অনেক সময় আমাদের চুপ থাকা বা পিছিয়ে যাওয়া অন্য পক্ষকে আমাদের দুর্বল ভাবার সুযোগ করে দেয়। নিজের সামর্থ্য ও সত্যের মর্যাদা রক্ষা করা প্রতিটি মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। অর্জুনকে এই লড়াই করতে হবে কেবল নিজের জন্য নয়, বরং সত্যের মর্যদা অটুট রাখার জন্য।
[ছবি: অর্জুন কানে হাত দিয়ে বসে আছেন যেন তিনি শত্রুদের কটু কথা শুনতে পাচ্ছেন না, কিন্তু তাঁর চোখ দিয়ে আগুনের স্ফুলিঙ্গ বের হচ্ছে।]