॥ অধ্যায় ২, শ্লোক ৪৫ ॥

ত্রৈগুণ্যবিষয়া বেদা নিস্ত্রৈগুণ্যো ভব অর্জুন ।
নির্দ্বন্দ্বো নিত্যসত্ত্বস্থো নির্যোগক্ষেম আত্মবান্ ॥ ৪৫ ॥

সরল ভাবার্থ

বেদসমূহ প্রকৃতির তিনটি গুণের (সত্ত্ব, রজ ও তম) বর্ণনায় পূর্ণ। হে অর্জুন! তুমি এই গুণত্রয়ের ঊর্ধ্বে ওঠো। তুমি দ্বন্দ্বহীন হও, নিত্যসত্ত্বস্থ হও এবং লাভ-ক্ষতির চিন্তা ত্যাগ করে আত্মনিষ্ঠ হও।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

এটি শ্রীকৃষ্ণের দেওয়া অন্যতম বৈপ্লবিক উপদেশ। তিনি বলছেন যে, বেদের বেশিরভাগ অংশই প্রকৃতির তিনটি গুণের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু অর্জুনকে হতে হবে 'নিস্ত্রৈগুণ্য'—অর্থাৎ এই গুণগুলোর ঊর্ধ্বে। গুণ মানে এখানে মায়া বা বন্ধন। কৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন 'নির্দ্বন্দ্ব' হতে, যার অর্থ হলো সুখ-দুঃখ, জয়-পরাজয় বা মান-অপমানের দ্বন্দ্বে নিজেকে না ভাসানো। মানুষের মন যখন লাভ (যোগ) এবং রক্ষা (ক্ষেম)-এর চিন্তায় ব্যস্ত থাকে, তখন সে সত্যকে দেখতে পায় না।

ভগবান এখানে অর্জুনকে বলছেন 'আত্মবান্' হতে। এর অর্থ হলো নিজের আত্মার স্বরূপে প্রতিষ্ঠিত হওয়া। যতক্ষণ আমরা বাইরের জগতের ভালো-মন্দের দ্বারা চালিত হই, ততক্ষণ আমরা প্রকৃতির গোলাম। কিন্তু যখন আমরা এই গুণের ঊর্ধ্বে উঠি, তখন আমরা পরমেশ্বরের সাথে এক হতে পারি। সত্ত্ব গুণ ভালো হলেও তা মানুষকে গর্ব বা সুখে আবদ্ধ করে। রজ গুণ মানুষকে দৌড়ঝাঁপ ও অশান্তিতে রাখে। আর তম গুণ দেয় অন্ধকার ও অলসতা। কৃষ্ণ চান অর্জুন যেন শুদ্ধ চৈতন্যের স্তরে উন্নীত হন।

এই শ্লোকটি প্রতিটি মানুষের জন্য এক মহা-নির্দেশ। এটি আমাদের শেখায় যে, জীবনের সমস্ত অস্থিরতার মূল হলো 'যোগ-ক্ষেম' বা নতুন কিছু পাওয়ার এবং যা আছে তা ধরে রাখার আকুলতা। যখন আমরা এই আসক্তি ত্যাগ করি, তখনই আমরা প্রকৃত স্বাধীন হই। অর্জুনকে যুদ্ধের ময়দানে দাঁড়িয়েও এই নির্লিপ্ততা অর্জন করতে বলছেন শ্রীকৃষ্ণ। এটিই হলো প্রকৃত সন্ন্যাস—কাজে ডুবে থেকেও মনের দিক থেকে মুক্ত থাকা।
[Image showing the three gunas as chains (white, red, black) being broken by a soul] [ছবি: অর্জুনের চারপাশ থেকে তিনটি রঙিন আলো (গুণ) সরে যাচ্ছে এবং তিনি এক ধ্রুব জ্যোতির মধ্যে অবস্থান করছেন।]