সরল ভাবার্থ
বিশাল জলাশয় বা হ্রদ সামনে থাকলে ক্ষুদ্র কূপের প্রয়োজনীয়তা যেমন থাকে না, তেমনি পরম সত্যকে জানলে ব্রহ্মজ্ঞানীর কাছে বেদের কর্মফল সংক্রান্ত অংশগুলোর কোনো উপযোগিতা থাকে না।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
শ্রীকৃষ্ণ এখানে একটি অত্যন্ত চমৎকার উদাহরণের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক পূর্ণতা বোঝাচ্ছেন। তিনি বলছেন, যখন চারদিকে বন্যায় জল থৈ থৈ করে বা একটি বিশাল স্বচ্ছ হ্রদ থাকে, তখন কি কেউ পিপাসা মেটানোর জন্য ছোট কোনো কুয়োর খোঁজ করে? অবশ্যই না। কারণ বড় জলাশয়েই কুয়োর সমস্ত প্রয়োজন মিটে যায়। ঠিক তেমনি, যারা কেবল বেদের ছোট ছোট স্বর্গীয় বা বৈষয়িক ফলের আশায় যজ্ঞাদি করে, তারা সেই কুয়োর মতো। কিন্তু যিনি ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করেছেন, তিনি সেই বিশাল জলাশয়ের অধিকারী। তাঁর কাছে বেদের সেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফলের আর কোনো মূল্য নেই।
এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, আংশিক সত্যের চেয়ে পূর্ণ সত্যের সন্ধানে ব্রতী হওয়া উচিত। যারা 'বিজানতঃ' অর্থাৎ তত্ত্বজ্ঞানী, তারা জানেন যে ভগবান লাভ করলে জগতের সব পাওয়া হয়ে যায়। বেদের স্বর্গাদি ফলগুলো হলো সসীম এবং অস্থায়ী। কিন্তু ঈশ্বরীয় প্রেম বা জ্ঞান হলো অসীম। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে সেই বিশাল জলাশয় বা ব্রহ্মজ্ঞানের দিকে ডাক দিচ্ছেন। তিনি বলছেন, তুচ্ছ রাজ্য বা স্বর্গের লোভে না মজে পরম সত্তাকে জানো।
ধর্মীয় বিচারে, এটি শাস্ত্রীয় অন্ধত্ব থেকে মুক্তির গান। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন যে শাস্ত্র কেবল পথ দেখানোর জন্য, কিন্তু যখন তুমি গন্তব্যে পৌঁছে যাবে, তখন পথপ্রদর্শক মানচিত্রের আর প্রয়োজন থাকে না। জ্ঞানীর জন্য সমস্ত বেদ সেই ব্রহ্মজ্ঞানেই সমাহিত। এই মহান শিক্ষাটি আমাদের আধ্যাত্মিক কৃপণতা ত্যাগ করে এক বিশাল হৃদয়ের অধিকারী হতে সাহায্য করে। শ্রীকৃষ্ণ চান অর্জুন যেন একজন ক্ষুদ্র যোদ্ধার সীমানা ছাড়িয়ে এক আধ্যাত্মিক মহাপুরুষে পরিণত হন।
[ছবি: বিশাল এক সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ, যার সামনে ছোট একটি কূপ নগণ্য হয়ে আছে।]