॥ অধ্যায় ২, শ্লোক ৪৭ ॥

কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন ।
মা কর্মফলহেতুর্ভুর্মা তে সঙ্গোঽস্ত্বকর্মণি ॥ ৪৭ ॥

সরল ভাবার্থ

কর্মে তোমার অধিকার আছে, কিন্তু ফলে কখনো নয়। তুমি কখনো নিজেকে কর্মফলের কারণ মনে করো না এবং কর্ম ত্যাগ করার প্রতিও যেন তোমার আসক্তি না জন্মে।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

এটি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার সার নির্যাস এবং বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কর্মদর্শন। শ্রীকৃষ্ণ এখানে নিষ্কাম কর্মযোগের চারটি প্রধান স্তম্ভ বর্ণনা করেছেন। প্রথমত, 'কর্মণ্যেবাধিকারস্তে'—অর্থাৎ মানুষের একমাত্র অধিকার হলো কাজ করা। ফলাফল আমাদের হাতে নেই কারণ ফল বহু জাগতিক কারণ ও ঈশ্বরের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। দ্বিতীয়ত, 'মা ফলেষু কদাচন'—ফলের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করো। কারণ ফলের চিন্তা আমাদের কর্মের গুণমান কমিয়ে দেয় এবং দুশ্চিন্তা জন্মায়। তৃতীয়ত, 'মা কর্মফলহেতুর্ভুঃ'—নিজেকে ফলের স্রষ্টা মনে করো না। যদি জয় আসে তবে তা তোমার একার শক্তিতে নয়, আবার পরাজয় এলেও তা কেবল তোমার দোষ নয়। চতুর্থত, 'মা তে সঙ্গোঽস্ত্বকর্মণি'—ফলাফল অনিশ্চিত বলে অলস হয়ে কর্ম ত্যাগ করো না।

এই শ্লোকটি আমাদের মানসিক চাপের হাত থেকে মুক্তি দেয়। আমরা যখন কেবল কাজ করি, তখন আমরা বর্তমানে বাঁচি। কিন্তু যখন ফলের চিন্তা করি, তখন আমরা ভবিষ্যতে বাস করি এবং উৎকণ্ঠায় ভুগি। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন, তুমি যুদ্ধের ময়দানে তোমার শ্রেষ্ঠ অস্ত্রচালনা করো, কিন্তু জয়ী হবে কি না সেই ভার আমার ওপর ছেড়ে দাও। যখন কোনো মানুষ ফলের আশা ছাড়াই কাজ করে, তখন তার শক্তি বহুগুণ বেড়ে যায় কারণ তার মনে কোনো ভয় বা সংশয় থাকে না।

ধর্মীয় বিচারে, এটি হলো ঈশ্বরের ওপর পূর্ণ বিশ্বাস। এটি আমাদের অহংকার বিনাশ করে। যখন আমরা ভাবি যে আমরাই সব করছি, তখনই আমরা কর্মের বন্ধনে আটকা পড়ি। কিন্তু যখন আমরা ভাবি যে আমরা কেবল ঈশ্বরের যন্ত্র, তখনই আমরা মুক্তি পাই। এই শ্লোকটি আধুনিক যুগের শিক্ষার্থীদের জন্য, পেশাজীবীদের জন্য এবং প্রত্যেক মানুষের জন্য এক আলোকবর্তিকা। এটি আমাদের শেখায় কীভাবে সাফল্য ও ব্যর্থতাকে সমানভাবে গ্রহণ করে অবিচল থাকতে হয়।
[ছবি: একজন মানুষ কোনো প্রত্যাশা ছাড়া তার কাজ করে যাচ্ছে এবং চারদিকে ঈশ্বরের আশীর্বাদ ঝরে পড়ছে।]