সরল ভাবার্থ
হে ধনঞ্জয়! আসক্তি ত্যাগ করো এবং সিদ্ধি ও অসিদ্ধিতে (সাফল্য ও ব্যর্থতায়) সমভাবাপন্ন হয়ে যোগস্থ হয়ে কর্ম করো। এই সমত্বকেই যোগ বলা হয়।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
শ্রীকৃষ্ণ এখানে 'যোগ' শব্দটির এক চমৎকার সংজ্ঞা দিয়েছেন—'সমত্বং যোগ উচ্যতে'। যোগ মানে কেবল হাত-পা নাড়ানোর ব্যায়াম নয়, যোগ হলো মনের এক গভীর সাম্যাবস্থা। ধনঞ্জয়কে (অর্জুনকে) ভগবান বলছেন যে, কাজ করতে হবে 'যোগস্থ' হয়ে। এর অর্থ হলো নিজের মনকে পরমেশ্বরে যুক্ত রেখে বাইরের কাজ করা। আসক্তি বা 'সঙ্গং' ত্যাগ করাই হলো প্রথম ধাপ। যখন আমরা কোনো কাজে অতিরিক্ত আসক্ত হই, তখন তার ফল আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলেই আমরা ভেঙে পড়ি।
শ্রীকৃষ্ণ আরও বলছেন যে, 'সিদ্ধ্যসিদ্ধ্যোঃ সমো ভূত্বা'—সাফল্য আসুক বা ব্যর্থতা আসুক, তাতে যেন মনের শান্তি বিঘ্নিত না হয়। এটি বলা সহজ কিন্তু করা কঠিন। কিন্তু অর্জুনকে একজন বীর যোদ্ধা হিসেবে এই মানসিক দৃঢ়তা অর্জন করতে হবে। জয়ী হলে যেমন অহংকারী হওয়া যাবে না, তেমনি হারলেও হতাশ হওয়া যাবে না। এই ভারসাম্যই হলো প্রকৃত আধ্যাত্মিকতা। একজন নিষ্কাম কর্মযোগী জানেন যে তিনি কেবল তাঁর সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করছেন, ফলাফল পরমাত্মার ইচ্ছা।
ধর্মীয় বিচারে, এটি হলো অহংকারের বিনাশ। যখন আমাদের বুদ্ধি স্থির হয়, তখন আমরা জগতের সমস্ত কাজকে উপাসনা হিসেবে দেখি। অর্জুনের যুদ্ধও তখন একটি যুদ্ধে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি মহৎ যোগে পরিণত হবে। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় কীভাবে আধুনিক যুগের উত্তাল প্রতিযোগিতার মধ্যেও শান্ত ও অবিচল থাকা যায়। যোগ মানে বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং কাজের মধ্যেই গভীর মনোযোগ ও মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখা। যখন আমরা লাভ-ক্ষতির ঊর্ধ্বে উঠি, তখনই আমরা প্রকৃত অর্থে স্বাধীন হই।
[ছবি: রণাঙ্গনের যুদ্ধের কোলাহলের মাঝে অর্জুনের শান্ত মুখমণ্ডল যা যোগের প্রতীক।]