॥ অধ্যায় ২, শ্লোক ৪৯ ॥

দূরেণ হ্যবরং কর্ম বুদ্ধিযোগাদ্ধনঞ্জয় ।
বুদ্ধৌ শরণমন্বিচ্ছ কৃপণাঃ ফলহেতবঃ ॥ ৪৯ ॥

সরল ভাবার্থ

হে ধনঞ্জয়! নিষ্কাম বুদ্ধিযোগ অপেক্ষা সাকাম বা ফলের আশায় করা কর্ম অত্যন্ত নিকৃষ্ট। অতএব, তুমি বুদ্ধির (নিষ্কাম ভাবের) শরণাপন্ন হও; কারণ যারা ফলের প্রত্যাশা করে, তারা কৃপণ বা অত্যন্ত দীন।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

শ্রীকৃষ্ণ এখানে 'বুদ্ধিযোগ' বা নিষ্কাম কর্মের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করছেন। তিনি বলছেন যে, কোনো কাজ কেবল ব্যক্তিগত লাভের জন্য করা অত্যন্ত নিচুমানের কাজ। একে তিনি 'অবরং কর্ম' বলেছেন। কারণ সাকাম কর্ম মানুষকে বাসনার জালে বন্দি করে এবং বারবার জন্ম-মৃত্যুর যন্ত্রণায় ফেলে। অন্যদিকে, বুদ্ধিযোগ বা ফলাকাঙ্ক্ষাহীন কর্ম মানুষকে মুক্তির পথে নিয়ে যায়। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন, তুমি বুদ্ধির অর্থাৎ সমত্বের শরণাপন্ন হও।

ভগবান এই শ্লোকে একটি খুব কড়া শব্দ ব্যবহার করেছেন—'কৃপণাঃ'। কৃপণ মানে আমরা সাধারণত বুঝি যে টাকা খরচ করতে চায় না। কিন্তু উপনিষদ ও গীতার ভাষায় কৃপণ হলো সেই ব্যক্তি, যে এই অমূল্য মানব জীবন পেয়েও কেবল তুচ্ছ বৈষয়িক সুখের পেছনে ছুটে বেড়ায় এবং নিজের আধ্যাত্মিক উন্নতি করে না। তারা দীন বা দরিদ্র কারণ তাদের আনন্দ বাইরের ফলের ওপর নির্ভর করে। যদি ফল ভালো হয় তবে তারা হাসে, আর ফল খারাপ হলে তারা কাঁদে। তারা নিজেদের ভাগ্যের দাসে পরিণত হয়েছে।

এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, বড় লক্ষ্য নিয়ে বাঁচতে হবে। আমরা যদি কেবল ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য কাজ করি, তবে আমাদের জীবন ব্যর্থ। কিন্তু যখন আমরা এক বিশাল আদর্শ বা ঈশ্বরের প্রীতির জন্য কাজ করি, তখন আমরাই প্রকৃত ধনী। অর্জুনকে কৃষ্ণ বলছেন, তুমি যদি কেবল রাজত্বের জন্য যুদ্ধ করো, তবে তুমি কৃপণ। কিন্তু তুমি যদি ধর্মের জন্য এবং আমার নির্দেশে যুদ্ধ করো, তবে তুমি মহান যোদ্ধা। এই শিক্ষাটি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এটি আমাদের ক্ষুদ্র স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করে।
[ছবি: অর্জুনের মনে জাগতিক ফলের লালসা দূর হয়ে এক মহৎ আদর্শের আলো ফুটে উঠছে।]