॥ অধ্যায় ২, শ্লোক ১৯ ॥

য এনং বেত্তি হন্তারং যশ্চৈনং মন্যতে হতম্ ।
উভৌ তৌ ন বিজানীতো নায়ং হন্তি ন হন্যতে ॥ ১৯ ॥

সরল ভাবার্থ: যে ব্যক্তি মনে করে আত্মা হত্যা করে অথবা আত্মা নিহত হয়, তারা উভয়েই প্রকৃত সত্য জানে না। আত্মা কাউকে হত্যা করে না, আত্মাকেও হত্যা করা যায় না।

ধর্মীয় প্রেক্ষাপট ও গভীর ব্যাখ্যা: এই শ্লোকটি আত্মা সম্পর্কে মানুষের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাকে সরাসরি ভেঙে দেয়। সাধারণভাবে আমরা মনে করি—একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে হত্যা করে। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে এই ধারণা আংশিক সত্য। কারণ হত্যা দেহের স্তরে ঘটে, আত্মার স্তরে নয়। আত্মা কখনো হত্যাকারী নয়, আবার কখনো নিহতও নয়। শ্রীকৃষ্ণ এখানে স্পষ্ট করে বলছেন— যারা আত্মাকে হত্যাকারী বা নিহত বলে মনে করে, তারা আত্মার প্রকৃত স্বরূপ বোঝে না।

মানুষের সমস্ত ভয়, শোক ও অপরাধবোধের মূল এই ভুল ধারণার মধ্যেই নিহিত। আমরা দেহকেই “আমি” মনে করি, তাই দেহের ক্ষয় বা ধ্বংসকে নিজের ধ্বংস বলে ধরে নিই। কিন্তু গীতা শেখায়— আত্মা দেহের ব্যবহারকারী মাত্র, দেহের কর্ম আত্মাকে স্পর্শ করে না। এই উপলব্ধি না থাকলে মানুষ কর্ম করলেও ভয়ে কাঁপে, আবার কর্ম না করলেও অপরাধবোধে ভোগে।

এই শ্লোক অর্জুনের দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে আঘাত করছে। অর্জুন ভাবছেন— যুদ্ধ করলে তিনি আত্মীয়দের “মেরে ফেলবেন”। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন— তুমি দেহের কর্মের জন্য দায়ী, কিন্তু আত্মার বিনাশ তোমার দ্বারা সম্ভব নয়। এই উপলব্ধিই কর্মযোগের ভিত্তি, যেখানে মানুষ জ্ঞানসহ কর্ম করে, কিন্তু ফল ও আসক্তির বন্ধনে জড়িয়ে পড়ে না।
[ছবি: যুদ্ধক্ষেত্রে দেহের সংঘাত, কিন্তু তার ঊর্ধ্বে আলোর মতো আত্মা।]