॥ অধ্যায় ২, শ্লোক ৬৮ ॥

তস্মাদ্যস্য মহাবাহো নিগৃহীতানি সর্বশঃ ।
ইন্দ্রিয়াণীন্দ্রিয়ার্থেভ্যস্তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা ॥ ২.৬৮ ॥

সরল ভাবার্থ

অতএব হে মহাবাহো! যাঁর ইন্দ্রিয়সমূহ সবদিক থেকে বিষয়ের আকর্ষণ থেকে নিগৃহীত বা সংযত হয়েছে, তাঁরই প্রজ্ঞা স্থির বা সুপ্রতিষ্ঠিত।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

আগের শ্লোকে ইন্দ্রিয়ের ধ্বংসাত্মক শক্তির কথা বলার পর শ্রীকৃষ্ণ এখানে সমাধানের সারসংক্ষেপ করছেন। তিনি অর্জুনকে 'মহাবাহো' বলে সম্বোধন করেছেন। মহাবাহো মানে যার বাহু অত্যন্ত শক্তিশালী। শ্রীকৃষ্ণ এখানে একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত দিচ্ছেন—বাহ্যিক বাহুবল দিয়ে শত্রু জয় করা সহজ, কিন্তু প্রকৃত বীর সেই যার অন্তরের ইন্দ্রিয়গুলো তার নিজের আয়ত্তে।

'নিগৃহীতানি সর্বশঃ'—অর্থাৎ সব দিক থেকে ইন্দ্রিয় দমন। এর মানে এই নয় যে চোখ দিয়ে দেখা যাবে না বা কান দিয়ে শোনা যাবে না। এর প্রকৃত অর্থ হলো ইন্দ্রিয়ের ওপর কর্তৃত্ব স্থাপন করা। যখন কোনো মানুষ বুঝতে পারেন যে ইন্দ্রিয়গুলো তাঁর সেবক, মালিক নয়, তখনই তিনি স্থিরপ্রজ্ঞ হন। প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা হওয়ার প্রধান শর্ত হলো বিষয়ের প্রতি অনাসক্তি। যখন আমাদের মন বাইরের রূপ-রস-শব্দ-স্পর্শের গোলামি করা বন্ধ করে দেয়, তখনই আমাদের বুদ্ধি নির্মল হয় এবং সত্যকে দেখতে পায়।

ধর্মীয় বিচারে, এটি হলো যোগের চূড়ান্ত ফল। অর্জুনকে যুদ্ধ করতে হবে, কিন্তু সেই যুদ্ধের প্রতিটি পদক্ষেপে তাঁকে সংযত থাকতে হবে। যদি তিনি রাগের মাথায় বা মায়ার বশবর্তী হয়ে যুদ্ধ করেন, তবে তা অধর্ম হবে। কিন্তু যদি তিনি তাঁর ইন্দ্রিয়গুলোকে কর্তব্যবুদ্ধিতে নিয়োগ করেন, তবে তা হবে ভগবানের সেবা। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে জীবনের সফলতার মাপকাঠি হলো আত্মসংযম। যারা নিজেদের জয় করতে পেরেছে, পুরো জগত তাদের কাছে পরাজিত হয়। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে সেই মানসিক উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাইছেন যেখানে কোনো পরিস্থিতির ঘাত-প্রতিঘাত তাঁর স্থির বুদ্ধিকে আর স্পর্শ করতে পারবে না।