॥ অধ্যায় ২, শ্লোক ৬৯ ॥

যা নিশা সর্বভূতানাং তস্যাং জাগর্তি সংযমী ।
যস্যাং জাগ্রতি ভূতানি সা নিশা পশ্যতো মুনেঃ ॥ ২.৬৯ ॥

সরল ভাবার্থ

সাধারণ মানুষের কাছে যা রাত, সংযমী ব্যক্তি সেখানে জেগে থাকেন। আর সাধারণ মানুষ যেখানে জেগে থাকে (জাগতিক ভোগে), তত্ত্বদর্শী মুনির কাছে তা হলো রাত।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

এটি গীতার একটি অত্যন্ত কাব্যিক এবং আধ্যাত্মিক শ্লোক। এখানে 'রাত' এবং 'দিন' বলতে সাধারণ সময় বোঝানো হয়নি, বরং চেতনার ভিন্নতা বোঝানো হয়েছে। সাধারণ মানুষ অর্থ, ক্ষমতা, ভোগ এবং ইন্দ্রিয়সুখে মগ্ন থাকে—শ্রীকৃষ্ণ বলছেন এটি হলো তাদের 'দিন'। কিন্তু একজন তত্ত্বদর্শী মুনির কাছে এগুলো কোনো মূল্য রাখে না, তাঁর কাছে এগুলো অন্ধকারের মতো অর্থাৎ 'রাত'।

আবার আত্মার স্বরূপ, পরমেশ্বরের সান্নিধ্য এবং আধ্যাত্মিক শান্তি—যা সাধারণ মানুষের কাছে ধরাছোঁয়ার বাইরে বা গুরুত্বহীন (অর্থাৎ তাদের কাছে রাত)—সেখানেই সংযমী ব্যক্তি জেগে থাকেন এবং আনন্দ পান। এই বৈপরীত্যই একজন সাধক এবং একজন ভোগীর মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয়। মুনি দেখেন যা সত্য তা স্থায়ী, আর সাধারণ মানুষ যাকে সত্য মনে করে তা হলো ক্ষণস্থায়ী মায়া।

ধর্মীয় বিচারে, এটি হলো দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। অর্জুন যখন কেবল একটি রাজ্য বা আত্মীয়দের মৃত্যুর কথা ভাবছিলেন, তখন তিনি সাধারণ মানুষের মতো দেখছিলেন। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে উচ্চতর সত্যের দিকে তাকাতে বলছেন। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে জগতের মোহে অন্ধ না হয়ে আত্মার আলোতে জাগরিত হতে হবে। যা এই জগতকে আনন্দ দেয়, তা শেষ পর্যন্ত দুঃখই নিয়ে আসে। কিন্তু যা শুরুতেই কঠিন মনে হয় (যেমন সংযম), তা শেষ পর্যন্ত অমৃতে পরিণত হয়। এই চেতনা অর্জন করাই হলো প্রকৃত মুনি হওয়া।