সরল ভাবার্থ
অল্পজ্ঞানী ব্যক্তিরা বেদের সেই সমস্ত পুষ্পিত বাক্যে মুগ্ধ হয়, যা কেবল স্বর্গলাভ ও ভোগৈশ্বর্যের কথা বলে। তারা মনে করে এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কিছু নেই। কামনায় পূর্ণ ও স্বর্গকামী এই ব্যক্তিদের চিত্ত ভোগ ও ঐশ্বর্যের প্রতি আকৃষ্ট থাকে, যার ফলে তাদের বুদ্ধি সমধিস্থ বা পরমেশ্বরে স্থির হতে পারে না।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
এই তিনটি শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ সেই সব মানুষের কথা বলছেন যারা ধর্মকে কেবল জাগতিক সুখের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। বেদের কর্মখণ্ডে নানা রকম যজ্ঞের কথা বলা হয়েছে যা করলে স্বর্গে যাওয়া যায় বা ধন-সম্পদ পাওয়া যায়। শ্রীকৃষ্ণ এই সুন্দর কিন্তু অন্তসারশূন্য বাক্যগুলোকে 'পুষ্পিতাং বাচং' বা পুষ্পিত বাক্য বলেছেন। যেমন কোনো বিষাক্ত গাছে সুন্দর ফুল ফুটলে মানুষ তার মরণঘাতী গুণের কথা ভুলে ফুলের মোহে পড়ে, তেমনি সাধারণ মানুষ কেবল বৈষয়িক লাভের আশায় ধর্মকর্ম করে।
এই শ্লোকগুলো অত্যন্ত সাহসী এবং বিপ্লবী। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন যে, যারা কেবল 'ভোগৈশ্বর্যপ্রসক্তানাং' অর্থাৎ ভোগ ও ক্ষমতার পেছনে ছুটে বেড়ায়, তাদের বুদ্ধি কোনোদিনও 'ব্যবসায়াত্মিকা' বা স্থির হতে পারে না। তাদের চেতনা ভোগবাদ দ্বারা অপহৃত বা চুরি হয়ে গেছে। তারা মনে করে স্বর্গের উচ্চতর জীবনই হলো জীবনের শেষ লক্ষ্য। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে জানাচ্ছেন যে, জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তিই হলো আসল ধর্ম। যারা কেবল স্বর্গ পেতে চায়, তাদের বারবার পৃথিবীতে ফিরে আসতে হয়।
ধর্মীয় বিচারে, অর্জুনকে 'পার্থ' বলে সম্বোধন করে কৃষ্ণ তাঁকে এই বৈষয়িক প্রলোভনের ঊর্ধ্বে উঠতে বলছেন। একজন প্রকৃত সাধকের লক্ষ্য হবে পরম সত্য লাভ করা, কোনো অস্থায়ী সুখ নয়। যারা ধর্মকে বাণিজ্যের মতো ব্যবহার করে, তারা আসলে আধ্যাত্মিক ভাবে দেউলিয়া। শ্রীকৃষ্ণ এখানে সরাসরি বেদের সগুণ অংশের আসক্তি ত্যাগ করার কথা বলছেন। তিনি অর্জুনকে সাবধান করছেন যে, যদি তুমি কেবল হার-জিত বা রাজ্য ভোগের কথা ভাবো, তবে তুমি কোনোদিনও সত্যের সন্ধান পাবে না। এই শিক্ষাটি বর্তমান যুগের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, যেখানে আমরা ধর্মের চেয়ে বাহ্যিক আচার আর পার্থিব লাভকে বেশি গুরুত্ব দেই। শ্রীকৃষ্ণ আমাদের শিখাচ্ছেন যে চিত্তশুদ্ধিই হলো ধর্মের প্রাণ।
[ছবি: একদল মানুষ সোনার সিংহাসন আর ভোগের বস্তুর পেছনে ছুটছে এবং তাদের পেছনে যমরাজের ছায়া দেখা যাচ্ছে।]