সরল ভাবার্থ
জন্ম গ্রহণ করলে মৃত্যু সুনিশ্চিত এবং মৃত্যু হলে জন্মও সুনিশ্চিত। অতএব, এই অনিবার্য বিষয়ে তোমার শোক করা উচিত নয়।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
এই শ্লোকটি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অন্যতম বিখ্যাত দর্শন—যাকে বলা হয় 'অনিবার্যতার নিয়ম'। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন যে, জগত প্রপঞ্চে জন্ম এবং মৃত্যু মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। যা জন্মেছে, তার বিনাশ কেউ আটকাতে পারবে না, আর যার বিনাশ হয়েছে, তার পুনর্জন্মও প্রকৃতির নিয়মে ঘটবে। এটি একটি অনন্ত চক্র। অর্জুন যদি যুদ্ধ নাও করেন, তবুও ভীষ্ম বা দ্রোণাচার্যের মৃত্যু একদিন না একদিন হবেই। অর্জুন নিজে অমর নন। তাহলে যা অপ্রতিরোধ্য বা 'অপরিহার্য', তাকে নিয়ে বিলাপ করা কি বীরের সাজে?
ধর্মীয় ও দার্শনিক বিচারে, শ্রীকৃষ্ণ এখানে অর্জুনকে 'অপরিহার্যেঽর্থে' অর্থাৎ যা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, তার প্রতি সমদৃষ্টি হওয়ার কথা বলছেন। আমাদের শোক সাধারণত জন্ম-মৃত্যুকে ঘিরে আবর্তিত হয় কারণ আমরা দেহকে সত্য বলে মনে করি। শ্রীকৃষ্ণ এই মোহের ওপর আঘাত করছেন। তিনি বলছেন, তুমি যদি যুদ্ধ না করো, তবুও তারা মারা যাবে। তুমি কেবল উপলক্ষ মাত্র। হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী, মৃত্যু কেবল একটি পোশাক পরিবর্তনের মতো। এই অমোঘ সত্য জানলে মানুষের মনে ভয় দূর হয়।
অর্জুনকে এখানে তাঁর কর্তব্যের কথা মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মৃত্যুর ভয়ে যুদ্ধ ত্যাগ করা মানে প্রকৃতির অমোঘ নিয়মকে অস্বীকার করা। শ্রীকৃষ্ণ চাইছেন অর্জুন যেন ব্যক্তিগত আসক্তি ছেড়ে মহাজাগতিক সত্যকে বুঝতে পারেন। শোক আসে অজ্ঞতা থেকে। যখন মানুষ বোঝে যে মৃত্যুও জীবনেরই একটি অংশ, তখন সে নির্ভীক হতে পারে। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, জীবনের যে কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে যা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তা নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট না করে বর্তমানে নিজের কাজ করে যাওয়াই হলো প্রকৃত ধর্ম।
[ছবি: একটি সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের প্রতীকী ছবি যা জীবনের আসা-যাওয়ার চিরন্তন চক্রকে নির্দেশ করছে।]