সরল ভাবার্থ
হে ভারত! সমস্ত জীব জন্মের পূর্বে অপ্রকাশিত ছিল, জন্মের পর এবং মৃত্যুর পূর্বে প্রকাশিত থাকে এবং মৃত্যুর পর পুনরায় অপ্রকাশিত হয়ে যায়। অতএব, এর জন্য শোক করার কী আছে?
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
এই শ্লোকটি অস্তিত্বের রহস্যকে খুব সহজভাবে ব্যাখ্যা করেছে। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন যে, এই যে প্রিয়জনদের তুমি দেখছো, জন্মের আগে তারা কোথায় ছিল? তুমি জানতে না। মৃত্যুর পর তারা আবার সেই অজানায় হারিয়ে যাবে। তারা কেবল মাঝখানের এই সামান্য সময়ে তোমার সামনে 'ব্যক্ত' বা প্রকাশিত হয়েছে। যা শুরুতে ছিল না এবং শেষে থাকবে না, তা মাঝখানের সময়েও কেবল এক মায়াবী প্রকাশ মাত্র। একেই হিন্দু দর্শনে 'অব্যক্ত' বলা হয়।
ধর্মীয় বিচারে, শ্রীকৃষ্ণ এখানে 'ভারত' বলে সম্বোধন করে অর্জুনের উজ্জ্বল বংশমর্যাদাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। তিনি বলছেন যে, আমরা যখন কোনো স্বপ্ন দেখি, স্বপ্নের চরিত্রগুলো স্বপ্নের ভেতর সত্য বলে মনে হয়, কিন্তু জেগে উঠলে তাদের আর হদিস পাওয়া যায় না। জীবনও ঠিক তেমনি। আমাদের সম্পর্কের বন্ধনগুলো মাঝখানের একটি ক্ষুদ্র সময়ের জন্য তৈরি হয়। মৃত্যুর মাধ্যমে তারা আবার তাদের মূল সত্তায় ফিরে যায়।
'তত্র কা পরিদেবনা'—অর্থাৎ এখানে বিলাপ করার মতো কী আছে? অর্জুনের শোকটি হলো তাঁর প্রিয়জনদের দৃশ্যমান শরীর হারিয়ে ফেলার ভয়। শ্রীকৃষ্ণ তাকে আধ্যাত্মিক দূরবীন দিয়ে দেখাচ্ছেন যে, তারা আগেও ছিল অন্য রূপে, পরেও থাকবে অন্য রূপে। এই মধ্যবর্তী সময়টুকুর জন্য এত বড় যুদ্ধ থেকে বিচ্যুত হওয়া অর্থহীন। এই শ্লোকটি আমাদের জীবনের অস্থিরতাকে শান্ত করে। এটি আমাদের শেখায় যে জীবন একটি মহাসমুদ্রের ঢেউয়ের মতো—ঢেউটি ওঠার আগে জল ছিল, ভেঙে যাওয়ার পরও জল থাকবে, কেবল মুহূর্তের জন্য তার একটি নাম ও রূপ তৈরি হয়েছে। এই গভীর জ্ঞান মানুষকে শোকমুক্ত এবং কর্মঠ হতে সাহায্য করে।
[ছবি: সমুদ্রের ঢেউয়ের ছবি, যেখানে একটি ঢেউ উঠছে (জন্ম) এবং আরেকটি মিশে যাচ্ছে (মৃত্যু)।]