॥ অধ্যায় ২, শ্লোক ৪১ ॥

ব্যবসায়াত্মিকা বুদ্ধিহেকেহ কুরু নন্দন ।
বহুশাখা হ্যনন্তাশ্চ বুদ্ধয়োঽব্যবসায়িনাম্ ॥ ৪১ ॥

সরল ভাবার্থ

হে কুরুনন্দন! এই নিষ্কাম কর্মযোগের পথে বুদ্ধি একনিষ্ঠ বা স্থির; কিন্তু অস্থিরচিত্ত ব্যক্তিদের বুদ্ধি বহু শাখাবিশিষ্ট ও অনন্ত হয়।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

শ্রীকৃষ্ণ এখানে 'ব্যবসায়াত্মিকা বুদ্ধি' বা সংকল্পবদ্ধ বুদ্ধির গুরুত্ব বোঝাচ্ছেন। আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য মনের একাগ্রতা অত্যন্ত প্রয়োজন। যারা নিষ্কাম কর্মযোগী, তাদের লক্ষ্য কেবল একটি—পরমেশ্বরের সন্তুষ্টি বিধান। এই একনিষ্ঠ লক্ষ্য থাকার কারণে তাদের বুদ্ধি বিভ্রান্ত হয় না। তারা জানে যে কর্ম করাই তাদের ধর্ম এবং ফল ঈশ্বরের হাতে। অন্যদিকে, যারা সকাম অর্থাৎ ফলের আশায় কাজ করে, তাদের বুদ্ধি 'বহুশাখা' বিশিষ্ট হয়। তাদের মন সবসময় হাজারো কামনায় বিক্ষিপ্ত থাকে—এই কাজ করলে কি টাকা পাব?, লোকেরা কি প্রশংসা করবে?, যদি হেরে যাই তবে কী হবে?—এই ধরণের অগুনতি চিন্তা তাদের বুদ্ধিকে দুর্বল করে দেয়।

ধর্মীয় বিচারে, শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে 'কুরু নন্দন' বলে সম্বোধন করেছেন তাঁর বংশের মর্যাদা মনে করিয়ে দিতে। তিনি বলছেন যে, অস্থির বুদ্ধি মানুষকে কেবল অশান্তি আর পরাধীনতা দেয়। একজন সাধকের বুদ্ধি হবে একটি তীরের মতো, যা কেবল লক্ষ্যবস্তুকেই চেনে। যখন বুদ্ধি স্থির হয়, তখন কর্ম হয়ে ওঠে সাবলীল এবং শক্তিশালী। অর্জুন যখন ফলের চিন্তা ছেড়ে কেবল কৃষ্ণের নির্দেশে যুদ্ধ করবেন, তখনই তাঁর বুদ্ধি ব্যবসায়াত্মিকা হবে।

এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, জীবনের যে কোনো ক্ষেত্রে সাফল্যের চাবিকাঠি হলো ফোকাস বা একাগ্রতা। যখন আমরা আমাদের শক্তিকে এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত করি, তখন পাহাড়কেও টলানো সম্ভব। কিন্তু যখন আমাদের ইচ্ছাগুলো চারিদিকে ছড়িয়ে থাকে, তখন আমরা কোনো কাজই ঠিকমতো করতে পারি না। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে, যুদ্ধের ভয় বা স্বজনপ্রীতি আসলে তাঁর বুদ্ধির বহু শাখা মাত্র, যা তাঁকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। প্রকৃত শান্তি পেতে হলে বুদ্ধিকে একমুখী করতে হবে।
[ছবি: একটি স্থির কম্পাস যা কেবল উত্তর দিক নির্দেশ করছে এবং এর বিপরীতে একটি বিক্ষিপ্ত মনের ছায়া।]