॥ অধ্যায় ২, শ্লোক ৬৭ ॥

ইন্দ্রিয়াণাং হি চরতাং যন্মনোঽনুবিলীয়তে ।
তদস্য হরতি প্রজ্ঞাং বায়ুর্নামবিবাম্ভসি ॥ ২.৬৭ ॥

সরল ভাবার্থ

বিচরণশীল ইন্দ্রিয়সমূহের মধ্যে মন যে কোনো একটির অনুগামী হলেই তা মানুষের প্রজ্ঞাকে হরণ করে—যেমন প্রবল বাতাস জলের ওপর নৌকাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

এই শ্লোকটি মানুষের মনস্তত্ত্বের এক গভীর সত্য প্রকাশ করে। শ্রীকৃষ্ণ এখানে বলছেন যে আমাদের ইন্দ্রিয়গুলো সবসময় বিষয়ের সন্ধানে ঘুরে বেড়ায়। এখন, মন যদি এই চঞ্চল ইন্দ্রিয়গুলোর যেকোনো একটির পেছনেও ছুটে যায়, তবে তা মানুষের বিচারবুদ্ধি বা প্রজ্ঞাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। ভগবান এখানে নৌকার উদাহরণ দিয়েছেন। একটি বিশাল নৌকা মাঝসমুদ্রে তার গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু যদি হঠাৎ একটি প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়া আসে, তবে সেই হাওয়া নৌকাটিকে তার সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করে প্রতিকূল দিকে নিয়ে যায়। আমাদের জীবনটাও সেই নৌকার মতো, আর আমাদের প্রজ্ঞা বা বিবেক হলো তার দিকনির্ণয়কারী কম্পাস।

ইন্দ্রিয়গুলো যখন কোনো প্রলোভনে মত্ত হয়, তখন মন যদি তাদের বাধা না দিয়ে তাদের অনুগামী হয় (অনুবিধীয়তে), তবে মানুষের হিতাহিত জ্ঞান লোপ পায়। অর্জুনকে শ্রীকৃষ্ণ সতর্ক করছেন যে, কেবল একটি দুর্বলতাই যথেষ্ট একজন শক্তিশালী মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য। অর্জুনের ক্ষেত্রে সেই দুর্বলতা ছিল মায়া ও মোহ। এই একটি মোহই তাঁর সমস্ত যুদ্ধবিদ্যার জ্ঞান এবং ক্ষত্রিয়ের কর্তব্যবোধকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল।

ধর্মীয় বিচারে, এটি হলো আত্মসংযমের গুরুত্ব। সাধক যখন আধ্যাত্মিক পথে চলেন, তখন তাঁকে প্রতিটি মুহূর্তে সজাগ থাকতে হয়। একটি ছোট ছিদ্র যেমন বড় জাহাজকে ডুবিয়ে দিতে পারে, তেমনি একটি অনিয়ন্ত্রিত ইন্দ্রিয় পুরো জীবনকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে মনের ওপর রাশ টানা কতটা জরুরি। যদি মন ইন্দ্রিয়ের দাস হয়, তবে পতন অনিবার্য। কিন্তু মন যদি বুদ্ধির শাসনে থাকে, তবেই মানুষ জীবনের উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে পরম শান্তিতে পৌঁছাতে পারে।