॥ অধ্যায় ২, শ্লোক ৩৪ ॥

অকীর্তিং চাপি ভূতানি কথয়িষ্যন্তি তেঽব্যয়াম্ ।
সম্ভাবিতস্য চাকীর্তির্মরণাদতিরিচ্যতে ॥ ৩৪ ॥

সরল ভাবার্থ

লোকে দীর্ঘকাল তোমার কলঙ্কের কথা ঘোষণা করবে; আর সম্মানীয় ব্যক্তির পক্ষে অপযশ মৃত্যু অপেক্ষা অধিক যন্ত্রণাদায়ক।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

শ্রীকৃষ্ণ এখানে মানুষের সামাজিক মর্যাদা এবং সম্মানের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি অর্জুনকে বলছেন যে, সারা বিশ্ব তোমাকে একজন অপরাজেয় বীর হিসেবে চেনে। যদি তুমি এখন যুদ্ধ ছেড়ে পালিয়ে যাও, তবে মানুষ তোমার এই কাজকে 'দয়া' বলবে না, বলবে 'ভয়'। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে লোকে তোমার কাপুরুষতার কাহিনী বলবে। একজন বীর বা মহৎ ব্যক্তির জন্য এই সামাজিক অসম্মান বা 'অকীর্তি' মৃত্যুর চেয়েও কঠিন।

এই শ্লোকটি ক্ষত্রিয়ের বীরধর্মকে জাগ্রত করার এক চূড়ান্ত কৌশল। ভগবান বলছেন, 'সম্ভাবিতস্য চাকীর্তির্মরণাদতিরিচ্যতে'—অর্থাৎ যার অনেক সম্মান আছে, তার সেই সম্মান চলে যাওয়া মানে জীবিত থেকেও মৃতবৎ থাকা। অর্জুন যে পরিবারের সদস্য, সেখানে যশের মূল্য প্রাণের চেয়েও বেশি। শ্রীকৃষ্ণ এখানে অর্জুনের মনস্তত্ত্ব নিয়ে খেলছেন। তিনি জানেন যে অর্জুন ধার্মিক, কিন্তু বর্তমানে তিনি মোহের বশে ভুল পথে হাঁটছেন।

ধর্মীয় বিচারে, সম্মান রক্ষা করা মানে অহংকার নয়, বরং নিজের দায়িত্ব ও বংশের মর্যাদা রক্ষা করা। একজন আদর্শ ব্যক্তি যদি তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত হন, তবে তা পুরো সমাজের জন্য একটি খারাপ উদাহরণ তৈরি করে। অর্জুন যদি আজ পিছু হটেন, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের যোদ্ধারাও অন্যায়ের সামনে পালানোর অজুহাত খুঁজে পাবে। তাই শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, জীবনের চেয়ে বড় হলো আদর্শ। যদি যুদ্ধে মৃত্যুও হয়, তবুও তা সেই অপমানের চেয়ে ভালো যা অর্জুনকে চিরকাল বয়ে বেড়াতে হবে। এই শিক্ষা আমাদের শেখায় যে, আমাদের সামাজিক দায়িত্ব এবং ভাবমূর্তি অনেক সময় আমাদের ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়েও বড় হওয়া উচিত।
[ছবি: অর্জুনের মুখমণ্ডলে অপমানের গ্লানি ফুটে উঠছে এবং চারপাশে যেন কাল্পনিক মানুষেরা তাঁর দিকে আঙ্গুল তুলে উপহাস করছে।]