॥ অধ্যায় ২, শ্লোক ১১ ॥
অশোচ্যানন্বশোচস্ত্বং প্রজ্ঞাবাদাংশ্চ ভাষসে ।
গতাসূনগতাসূংশ্চ নানুশোচন্তি পণ্ডিতাঃ ॥ ১১ ॥
সরল ভাবার্থ:
শ্রীকৃষ্ণ বললেন— তুমি যাদের জন্য শোক করা উচিত নয়,
তাদের জন্য শোক করছ, অথচ জ্ঞানীর মতো কথা বলছ।
প্রকৃত পণ্ডিতেরা জীবিত বা মৃত—কারো জন্যই শোক করে না।
ধর্মীয় প্রেক্ষাপট ও গভীর ব্যাখ্যা:
(১) এই শ্লোকের মাধ্যমে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সরাসরি অর্জুনের মানসিক দ্বন্দ্বে আঘাত করছেন।
অর্জুন নৈতিকতা, করুণা ও ধর্মের কথা বললেও তাঁর আচরণ সেই জ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
গীতা এখানে আমাদের শেখায়—শুধু জ্ঞানসম্মত কথা বললেই মানুষ জ্ঞানী হয় না।
সত্যিকার জ্ঞান তখনই প্রমাণিত হয়, যখন সংকটের মুহূর্তেও মন স্থির থাকে।
অর্জুন শোকগ্রস্ত, কারণ তিনি নিজেকে দেহের সঙ্গে এক করে দেখছেন।
(২) ‘অশোচ্যান’ শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
যাদের জন্য শোক করা উচিত নয়—অর্থাৎ আত্মা—তাদের জন্য শোক করা হচ্ছে।
গীতার দর্শনে আত্মা অবিনাশী, চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয়।
কিন্তু দেহের পরিবর্তনকে আমরা আত্মার মৃত্যু বলে ভুল করি।
এই ভ্রান্ত ধারণাই সমস্ত দুঃখের মূল।
কৃষ্ণ এখানে শোককে অজ্ঞানতার লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন।
(৩) এই শ্লোক আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথেও গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত।
আমরা অনেক সময় বড় বড় দর্শনের কথা বলি,
কিন্তু নিজের জীবনে সেই দর্শন প্রয়োগ করতে পারি না।
গীতা আমাদের শেখায়—জ্ঞান মানে শুধু জানা নয়,
জ্ঞান মানে উপলব্ধি এবং আচরণে তার প্রকাশ।
[ছবি: শ্রীকৃষ্ণ শান্তভাবে অর্জুনের দিকে তাকিয়ে আছেন, অর্জুন চিন্তিত।]