সরল ভাবার্থ
অর্জুন বললেন—হে মধুসূদন! হে অরিসূদন! আমি রণক্ষেত্রে কীভাবে ভীষ্ম ও দ্রোণাচার্যের মতো পরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বাণ নিক্ষেপ করে যুদ্ধ করব? তাঁরা তো আমার পূজনীয়।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
শ্রীকৃষ্ণের কঠোর তিরস্কারের পর অর্জুন তাঁর মনের প্রকৃত যন্ত্রণার কারণ প্রকাশ করছেন। অর্জুনের দ্বিধা হলো নৈতিক—যাঁদের পায়ে মাথা নত করা উচিত, তাঁদের শরীরে কীভাবে বাণ নিক্ষেপ করবেন? ভীষ্ম হলেন পিতামহ এবং দ্রোণ হলেন গুরু। হিন্দু সংস্কৃতিতে গুরু এবং গুরুজনদের প্রতি শ্রদ্ধা ভক্তির নামান্তর। অর্জুন এখানে কৃষ্ণকে 'মধুসূদন' এবং 'অরিসূদন' (শত্রু হরণকারী) বলে ডাকছেন। তিনি বলতে চাইছেন—তুমি শত্রু মারতে পারো, কিন্তু গুরুজনদের কি শত্রু ভাবা সম্ভব?
এই শ্লোকটি আমাদের জীবনের এক বড় দ্বন্দ্বকে ফুটিয়ে তোলে—যখন কর্তব্য এবং আবেগ মুখোমুখি দাঁড়ায়। অর্জুন এখানে ভুল করছেন কারণ তিনি দেহকে দেখছেন, আত্মাকে নয়। তিনি তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা ভাবছেন, কিন্তু তাঁরা যে অধর্মের পক্ষে লড়ছেন, সেই সত্যকে তিনি আবেগের কাছে বিসর্জন দিচ্ছেন। অর্জুনের এই 'পূজার্হ' বা পূজনীয় বোধ তাঁকে তাঁর 'ক্ষত্রিয় ধর্ম' পালন থেকে বিরত রাখছে।
ধর্মীয় বিচারে, এটি হলো মায়ার আর এক রূপ। অনেক সময় মায়া ধর্মের বেশ ধরে আসে। অর্জুন মনে করছেন তিনি খুব ধার্মিক কথা বলছেন, কিন্তু আসলে তিনি তাঁর নিজের দায়িত্ব এড়াতে চাইছেন। গুরু যদি অধর্মের পথ বেছে নেন, তবে শিষ্যের কর্তব্য হলো তাঁকে বাধা দেওয়া—এটিই শাস্ত্রের বিধান। অর্জুন এখনও সেই উচ্চতর জ্ঞানে পৌঁছাতে পারেননি, তাই তিনি জাগতিক সম্পর্কের জালে আটকা পড়েছেন। শ্রীকৃষ্ণ ধীরে ধীরে তাঁকে এই জাল থেকে মুক্ত করবেন।