সরল ভাবার্থ
সঞ্জয় বললেন—হে ভারত (ধৃতরাষ্ট্র)! উভয় সৈন্যদলের মাঝখানে সেই বিষাদগ্রস্ত অর্জুনকে হৃষীকেশ কৃষ্ণ যেন একটু হেসে এই কথাগুলো বললেন।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
এটি গীতার এক পরম বিস্ময়কর মুহূর্ত। অর্জুন কাঁদছেন, তাঁর ইন্দ্রিয়গুলো শুকিয়ে যাচ্ছে, তিনি রাজত্ব ছেড়ে ভিক্ষা করতে চাইছেন—কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ হাসছেন ('প্রহসন্নিব')। এই হাসি বিদ্রূপের নয়, বরং এটি হলো একজন গুরুর করুণাময় হাসি। কৃষ্ণ হাসছেন কারণ তিনি জানেন যে অর্জুনের এই মহান কান্নার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। এটি হলো মায়ার দ্বারা আক্রান্ত মানুষের করুণ দশা দেখে পরমাত্মার দিব্য হাস্য।
এই হাসি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জগতের কোনো ট্র্যাজেডিও ঈশ্বরকে বিচলিত করে না, কারণ তিনি সত্য জানেন। তিনি দেখছেন অর্জুন যাকে মৃত্যু বলছেন, তা আসলে কেবল দেহের পরিবর্তন। শ্রীকৃষ্ণ যেন হাসিমুখে বলতে চাইছেন—অর্জুন, তুমি বৃথা শোক করছ; তোমার এই দুঃখ কেবল অজ্ঞতার কারণে। এই হাসির মাধ্যমেই গীতামৃতের ধারা প্রবাহিত হবে যা অর্জুনের মোহকে ধুয়ে মুছে দেবে।
ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি হলো শোক থেকে আনন্দের উত্তরণ। ভগবান রণাঙ্গনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন কারণ আধ্যাত্মিক জ্ঞান ল্যাবরেটরিতে নয়, বরং জীবনের কঠিনতম সংগ্রামের মাঝেই ফলদায়ক হয়। শ্রীকৃষ্ণ এখানে জগৎগুরু রূপে আত্মপ্রকাশ করছেন। ১১ নম্বর শ্লোক থেকেই তিনি সেই অমর বাণী শুরু করবেন যা মহাকালের সীমা ছাড়িয়ে আজ আমাদের কাছেও এক ধ্রুব আলো। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে ঈশ্বরের সামনে আমাদের সমস্ত জাগতিক সমস্যা অত্যন্ত তুচ্ছ এবং তাঁর দিব্য হাসিই আমাদের জীবনের সমস্ত আঁধার দূর করতে সক্ষম।