সরল ভাবার্থ
সুখ-দুঃখ, লাভ-অলাভ এবং জয়-পরাজয়কে সমান জ্ঞান করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও। এরূপ করলে তোমাকে পাপ স্পর্শ করবে না।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
এটি হলো শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অন্যতম 'মহা-শ্লোক' যা নিষ্কাম কর্মযোগের ভিত্তিপ্রস্তর। এতক্ষণ শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে লাভ-ক্ষতি ও স্বর্গের কথা বলছিলেন, কিন্তু এই শ্লোকে তিনি তাকে এক উচ্চতর আধ্যাত্মিক স্তরে নিয়ে গেলেন। তিনি বলছেন, যদি তুমি যুদ্ধের ফল হিসেবে রাজ্য বা স্বর্গ কোনোটিরই আশা না করো এবং জয়-পরাজয়কে একই দৃষ্টিতে দেখো, তবেই তুমি প্রকৃত পাপমুক্ত হবে।
এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় 'স্থিতপ্রজ্ঞ' বা সমত্ব বুদ্ধির কথা। আমরা সাধারণত কোনো কাজ করি ফলের আশায়। কিন্তু যখন ফল আমাদের মনের মতো হয় না, তখন আমরা দুঃখ পাই। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, তুমি তোমার কর্তব্য করো কেবল কর্তব্যের খাতিরে। যখন তুমি মনের মধ্যে এই স্থিরতা আনবে যে—জয় আসুক বা পরাজয়, আমি কেবল আমার ধর্ম পালন করছি—তখন কোনো কাজই তোমাকে পাপের বন্ধনে জড়াতে পারবে না।
ধর্মীয় বিচারে, অর্জুনের ভয় ছিল স্বজন হত্যার পাপ নিয়ে। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, পাপ হয় তখন যখন মানুষ ব্যক্তিগত বাসনা বা অহংকার থেকে কিছু করে। কিন্তু যখন তুমি নিজেকে ঈশ্বরের যন্ত্র হিসেবে সমর্পণ করবে এবং সুখ-দুঃখের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করবে, তখন সেই কর্ম হবে এক ধরণের আরাধনা। এই শ্লোকটি আধুনিক জীবনের মানুষের জন্যও এক মহা-ঔষধ। আমরা যখন অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা না করে শান্ত মনে কেবল আমাদের কাজটুকু করে যাই, তখনই আমাদের কর্ম সার্থক হয়। অর্জুনকে এখানে শেখানো হচ্ছে যে মনের ভারসাম্যই হলো প্রকৃত শক্তি। এই ভারসাম্য অর্জিত হলে কোনো শত্রু বা কোনো পরিস্থিতিই মানুষকে টলাতে পারে না।
[ছবি: একটি পাল্লা বা তরাজু যা সম্পূর্ণ ভারসাম্যপূর্ণ হয়ে আছে, একদিকে জয়-সুখ-লাভ এবং অন্যদিকে পরাজয়-দুঃখ-অলাভ।]