সরল ভাবার্থ
আমি এতক্ষণ তোমাকে সাংখ্য বা জ্ঞানযোগ অনুসারে জ্ঞানের কথা বললাম। এখন নিষ্কাম কর্মযোগ সম্পর্কে শোনো; এই বুদ্ধিতে যুক্ত হয়ে তুমি কর্মের বন্ধন থেকে মুক্ত হবে।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
শ্রীকৃষ্ণ এখানে তাঁর আলোচনার দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করছেন। তিনি অর্জুনকে বলছেন যে, এতক্ষণ আমি তোমাকে 'সাংখ্য' বা আত্মার বিশ্লেষণাত্মক জ্ঞান দিয়েছি। কিন্তু কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জুনের বিষাদ দূর করতে পারবে না। তাই এখন তিনি তাঁকে 'যোগ' বা কর্মযোগের কথা বলবেন। কর্মযোগ হলো সেই পথ যেখানে কাজ করেও মানুষ কর্মের ফলে লিপ্ত হয় না।
ভগবান প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, যদি অর্জুন এই 'বুদ্ধি' বা কর্মযোগের দর্শন গ্রহণ করেন, তবে তিনি 'কর্মবন্ধং প্রহাস্যসি'—অর্থাৎ কর্মের সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করতে পারবেন। সাধারণত আমাদের প্রতিটি কাজ একটি ফলের জন্ম দেয়, যা আমাদের জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আটকে রাখে। কিন্তু কর্মযোগের মাধ্যমে কাজ করলে সেই কাজ আর বন্ধন তৈরি করে না, বরং তা মুক্তির পথ প্রশস্ত করে।
ধর্মীয় তত্ত্বে, সাংখ্য জ্ঞান হলো লক্ষ্য এবং যোগ হলো সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর উপায়। অর্জুন জানতেন যে আত্মা অমর, কিন্তু তাঁর মনের মায়া তাঁকে যুদ্ধ করতে বাধা দিচ্ছিল। শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে বোঝাচ্ছেন যে কর্ম থেকে পালানো মুক্তি নয়, বরং ফলের আশা ত্যাগ করে কর্ম করাই হলো প্রকৃত মুক্তি। অর্জুনকে এখানে 'পার্থ' বলে সম্বোধন করা হয়েছে তাঁর বংশের বিশুদ্ধতাকে সম্মান জানাতে। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে এক অত্যাধুনিক জীবন দর্শন দিচ্ছেন যেখানে কর্ম এবং জ্ঞান মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এটি কেবল অর্জুনের জন্য নয়, বরং আজকের যুগের সেই সমস্ত কর্মব্যস্ত মানুষের জন্য যারা কাজের চাপে পিষ্ট হয়ে মানসিক শান্তি খুঁজছেন। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, কাজের পদ্ধতি বদলে ফেলো, তাহলেই তুমি মুক্ত হবে।
[ছবি: একটি শিকল ভেঙে যাচ্ছে এবং একজোড়া হাত সেই শিকলের ঊর্ধ্বে স্বাধীনতার দিকে প্রসারিত হচ্ছে।]