॥ অধ্যায় ২, শ্লোক ৬১ ॥

তানি সর্বাণি সংযম্য যুক্ত আসীত মৎপরঃ ।
বশে হি যস্যেন্দ্রিয়াণি তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা ॥ ২.৬১ ॥

সরল ভাবার্থ

সেই সমস্ত ইন্দ্রিয়কে বশীভূত করে একাগ্রচিত্তে আমার (পরমেশ্বরের) প্রতি নিবিষ্ট হয়ে অবস্থান করা উচিত। কারণ যাঁর ইন্দ্রিয়সমূহ বশীভূত, তাঁরই প্রজ্ঞা স্থির হয়েছে।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

আগের শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বলেছিলেন যে ইন্দ্রিয়গুলো অত্যন্ত শক্তিশালী এবং তারা বুদ্ধিমান মানুষের মনকেও হরণ করতে পারে। এই শ্লোকে তিনি সেই সমস্যার সমাধান দিচ্ছেন। তিনি বলছেন যে কেবল জোর করে ইন্দ্রিয় দমন করলে হবে না, মনকে একটি উচ্চতর লক্ষ্য দিতে হবে। সেই লক্ষ্যটি হলো 'মৎপরঃ'—অর্থাৎ ভগবানে একাগ্র হওয়া। যখন কোনো মানুষ ইন্দ্রিয়গুলোকে বিষয় থেকে গুটিয়ে নিয়ে ভগবানের চিন্তা বা সেবায় যুক্ত করে, তখনই সে প্রকৃত জয় লাভ করে। ইন্দ্রিয়গুলো যেন বিষাক্ত সাপের মতো, যাদের বশ করতে হলে যোগ এবং ভক্তিরূপ মন্ত্রের প্রয়োজন।

শ্রীকৃষ্ণ এখানে 'যুক্ত' হওয়ার কথা বলেছেন। যুক্ত হওয়া মানে হলো বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়, বরং সংযোগ স্থাপন করা। যখন আমাদের বুদ্ধি পরমাত্মার সাথে যুক্ত হয়, তখন বাইরের প্রলোভনগুলো তুচ্ছ হয়ে যায়। অর্জুনকে কৃষ্ণ বোঝাচ্ছেন যে, নিজের শক্তির ওপর ভরসা না করে আমার ওপর (কৃষ্ণের ওপর) ভরসা করো। যার ইন্দ্রিয়গুলো তার দাসে পরিণত হয়েছে, সেই প্রকৃত স্বাধীন। অন্যদিকে, যে ইন্দ্রিয়ের দাসে পরিণত হয়েছে, সে রাজা হলেও আসলে ভিখারি।

ধর্মীয় বিচারে, এটি হলো ভক্তিযোগের প্রথম ইঙ্গিত। জ্ঞান এবং কর্ম তখনই সার্থক হয় যখন তা ঈশ্বরের সাথে যুক্ত হয়। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে আধ্যাত্মিক সাধনার মূল চাবিকাঠি হলো মনকে একটি ধ্রুব বিন্দুতে স্থির করা। জগতের শত কোলাহলের মাঝেও যদি কেউ ভগবানে নিবিষ্ট থাকে, তবে তার বুদ্ধি আর কোনোদিন বিভ্রান্ত হবে না। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন যে যুদ্ধের ময়দানেও তুমি 'মৎপরঃ' হয়ে থাকো, তাহলে কোনো পাপ বা মোহ তোমাকে স্পর্শ করতে পারবে না।