সরল ভাবার্থ
সঞ্জয় বললেন—পরন্তপ গুড়াকেশ (অর্জুন) হৃষীকেশ কৃষ্ণকে এই কথা বলে এবং আমি যুদ্ধ করব না বলে মৌনতা অবলম্বন করলেন।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
সঞ্জয় ধৃতরাষ্ট্রকে যুদ্ধের বর্তমান দৃশ্যটি বর্ণনা করছেন। অর্জুন এখানে 'গুড়াকেশ' নামে অভিহিত হয়েছেন, যার অর্থ হলো—যিনি নিদ্রাকে জয় করেছেন। অর্থাৎ অর্জুন অত্যন্ত সজাগ এবং সাহসী। অথচ সেই অর্জুনই আজ বিষাদের নিদ্রায় আচ্ছন্ন। তিনি কৃষ্ণকে (হৃষীকেশ—ইন্দ্রিয়ের অধিপতি) নিজের শেষ সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন—ন য়োৎস্য (আমি যুদ্ধ করব না)। এই মৌনতা বা চুপ করে যাওয়া হলো চরম মানসিক অবসাদের লক্ষণ।
অর্জুন যখন মৌন হলেন, তখন তিনি তাঁর সমস্ত যুক্তি এবং বিবাদ শেষ করলেন। তিনি এখন কেবল শ্রবণের জন্য প্রস্তুত। অর্জুন কৃষ্ণকে 'গোবিন্দ' বলে ডেকেছেন, যার অর্থ হলো—যিনি জ্ঞান এবং ইন্দ্রিয়সমূহকে নিয়ন্ত্রণ করেন। এটি অত্যন্ত প্রতীকী; অর্জুন তাঁর জীবনের নিয়ন্ত্রণ গোবিন্দের হাতে ছেড়ে দিলেন। সঞ্জয় এখানে ধৃতরাষ্ট্রকে আকারে ইঙ্গিতে বোঝাচ্ছেন যে, অর্জুন হয়তো মৌন হয়েছেন, কিন্তু তাঁর পথ প্রদর্শক হিসেবে স্বয়ং হৃষীকেশ জাগ্রত আছেন।
ধর্মীয় বিচারে, এই মৌনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গুরুর সামনে শিষ্যের বেশি কথা বলা সাজে না। যতক্ষণ শিষ্য নিজের পাণ্ডিত্যের বড়াই করে, ততক্ষণ গুরু কিছু বলেন না। যখন শিষ্য সব বলা শেষ করে চুপ হয়ে যায়, তখনই গুরুর বাণী শুরু হয়। অর্জুনের এই নীরবতা হলো তাঁর অন্তরের এক পরম আকুতি—যাতে ঈশ্বর তাঁর হৃদয়ে কথা বলেন। আমাদের জীবনেও যখন আমরা সব চেষ্টা করে হেরে যাই এবং চুপ হয়ে ঈশ্বরের অপেক্ষায় থাকি, তখনই প্রকৃত আধ্যাত্মিক উত্তরণ ঘটে।