॥ অধ্যায় ২, শ্লোক ৩১ ॥

স্বধর্মমপি চাবেক্ষ্য ন বিকম্পিতুমর্হসি ।
ধর্ম্যাদ্ধি যুদ্ধাচ্ছ্রেয়োঽন্যৎ ক্ষত্রিয়স্য ন বিদ্যতে ॥ ৩১ ॥

সরল ভাবার্থ

তোমার নিজের স্বধর্ম বিচার করেও তোমার বিচলিত হওয়া উচিত নয়; কারণ ধর্মের জন্য যুদ্ধ করা অপেক্ষা ক্ষত্রিয়ের পক্ষে আর শ্রেয় কিছু নেই।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

শ্রীকৃষ্ণ এখানে অর্জুনকে আত্মার উচ্চতর জ্ঞান থেকে নামিয়ে এনে তাঁর সামাজিক ও নৈতিক কর্তব্যের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। একেই বলা হয় 'স্বধর্ম'। স্বধর্ম মানে কেবল পেশা নয়, বরং যা মানুষের স্বভাবের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্তব্য। অর্জুন একজন ক্ষত্রিয়। ক্ষত্রিয়ের প্রধান ধর্ম হলো সমাজ থেকে অন্যায় দূর করা এবং প্রজাদের রক্ষা করা। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন যে, আধ্যাত্মিক বিচারে তো মৃত্যু নেই-ই, কিন্তু যদি তুমি তোমার জাগতিক ধর্মের কথা চিন্তা করো, তবে একজন যোদ্ধার কাছে ধর্মযুদ্ধের চেয়ে বড় সুযোগ আর কিছু হতে পারে না।

ধর্মীয় ও নৈতিক বিচারে, শ্রীকৃষ্ণ এখানে অর্জুনকে তাঁর 'বিকম্প' বা দ্বিধা ত্যাগ করতে বলছেন। আমরা অনেক সময় বড় বড় আধ্যাত্মিক কথার দোহাই দিয়ে আমাদের বর্তমান দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে চাই। অর্জুনও তাই করছিলেন। তিনি দয়ার কথা বলে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করতে চাইছিলেন। কিন্তু ভগবান বলছেন, একজন ক্ষত্রিয়ের জন্য অন্যায়ের সামনে নীরব থাকা বা পলায়ন করা সবচেয়ে বড় অধর্ম। হিন্দু শাস্ত্রে বলা হয়েছে, যখন শান্তি স্থাপনের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়, তখন অস্ত্র তুলে নেওয়াটাই হলো পুণ্য। অর্জুন যদি আজ যুদ্ধ না করেন, তবে পৃথিবীতে অধর্মের জয় হবে।

এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, প্রত্যেকের জীবনে একটি নির্দিষ্ট ভূমিকা থাকে। সেই ভূমিকা পালন করাই হলো ঈশ্বরের সেবা। অর্জুনের ভূমিকা হলো ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। নিজের কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হওয়া মানে নিজের আত্মার সাথে বিশ্বাসভঙ্গ করা। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে, আধ্যাত্মিকতা মানে কর্ম ত্যাগ করা নয়, বরং সঠিক সময়ে সঠিক কর্তব্য নির্ভীকভাবে পালন করা। অর্জুনের এই যুদ্ধ কোনো ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা নয়, এটি হলো এক পরম পবিত্র কর্তব্য।
[ছবি: শ্রীকৃষ্ণ আঙ্গুল দিয়ে যুদ্ধের ময়দান নির্দেশ করছেন এবং অর্জুন তাঁর দিকে গভীর মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে আছেন।]