সরল ভাবার্থ
হে মহাবাহো! আর যদি তুমি এই আত্মাকে সর্বদা জন্মশীল এবং সর্বদা মৃত্যুশীল বলে মনে করো, তবুও তোমার এভাবে শোক করা উচিত নয়।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
শ্রীকৃষ্ণ এখানে অর্জুনকে একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বোঝাচ্ছেন। আগের শ্লোকগুলোতে তিনি আত্মার অবিনশ্বরতা ব্যাখ্যা করেছেন, কিন্তু এই শ্লোকে তিনি অর্জুনের সম্ভাব্য তর্কের উত্তর দিচ্ছেন। অনেক সময় মানুষ মনে করে আত্মা বলে কিছু নেই, জীবন কেবল রাসায়নিক বিক্রিয়া বা দেহের জন্ম-মৃত্যুর মাঝের এক মুহূর্ত। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, হে মহাবাহো! যদি তুমি বৌদ্ধ বা চার্বাক দর্শনের মতো মনে করো যে আত্মা নিত্যই জন্মে এবং নিত্যই মারা যায়, তবুও তোমার যুদ্ধ ত্যাগ করে শোক করার কোনো যুক্তি নেই।
ধর্মীয় বিচারে, এখানে ভগবান 'মহা-বাহো' সম্বোধনটি ব্যবহার করেছেন যাতে অর্জুনের নিজের বীরত্বের কথা মনে পড়ে। শ্রীকৃষ্ণ বোঝাতে চাইছেন যে, জন্ম এবং মৃত্যু যদি একটি প্রাকৃতিক এবং অনিবার্য প্রক্রিয়া হয় যা প্রতি মুহূর্তে ঘটছে, তবে সেখানে বিলাপ করার কিছু নেই। আকাশ থেকে বৃষ্টি পড়ে, আবার তা বাষ্প হয়ে উড়ে যায়—এই চক্রে যেমন কেউ শোক করে না, তেমনি জীবনের এই প্রবাহে শোক করা নিরর্থক। অর্জুন এখানে মায়ার বশবর্তী হয়ে ভাবছেন যে তিনি কাউকে 'মেরে' ফেলছেন।
এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, সত্যকে জানার একাধিক স্তর আছে। পরম সত্য হলো আত্মা অমর, কিন্তু যারা তা বুঝতে পারে না, তাদের জন্যও জাগতিক নিয়ম হলো—যা পরিবর্তনশীল তার জন্য শোক করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বাস্তববাদী হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। তিনি অর্জুনের আবেগকে যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করছেন। যুদ্ধের ময়দানে দাঁড়িয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়া একজন ক্ষত্রিয়র জন্য অধর্ম। এই শ্লোকের মাধ্যমে কৃষ্ণ অর্জুনের সব ধরণের তর্কের পথ বন্ধ করে দিচ্ছেন।
[ছবি: শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের কাঁধে হাত দিয়ে অত্যন্ত শান্ত ভঙ্গিতে তাঁকে জীবনের অমোঘ চক্রের কথা বোঝাচ্ছেন।]