সরল ভাবার্থ
সঞ্জয় বললেন—অর্জুনকে সেইভাবে কৃপাবিষ্ট, বিষাদগ্রস্ত এবং অশ্রুপূর্ণ ব্যাকুল নেত্র দেখে মধুসূদন কৃষ্ণ এই বাক্যটি বললেন।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
দ্বিতীয় অধ্যায়ের শুরুতেই সঞ্জয় অর্জুনের মানসিক অবস্থার এক করুণ ছবি ধৃতরাষ্ট্রের সামনে তুলে ধরছেন। অর্জুন ছিলেন এক অপরাজেয় বীর, কিন্তু মহাযুদ্ধের শুরুতেই তিনি মায়া ও মোহে আক্রান্ত হলেন। এখানে 'কৃপয়া' শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্জুনের এই দয়া বা কৃপা সাধারণ মানুষের কাছে ভালো মনে হলেও, তা ছিল আসলে দায়িত্ব থেকে পালানোর অজুহাত। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে 'অশ্রুপূর্ণাকুলেক্ষণম্' অর্থাৎ অশ্রুসজল চোখে দেখলেন। একজন বীরের চোখে জল আসা মানে তাঁর মানসিক দুর্বলতা চূড়ান্তে পৌঁছেছে।
ভগবানকে এখানে 'মধুসূদন' বলা হয়েছে। মধুসূদন মানে যিনি মধু নামক অসুরকে সংহার করেছিলেন। সঞ্জয় এখানে ইঙ্গিতে ধৃতরাষ্ট্রকে বোঝাচ্ছেন যে, ভগবান যেমন অসুর নাশ করেন, তেমনি তিনি অর্জুনের মনের ভেতরের মোহরূপ অসুরকেও নাশ করবেন। অর্জুনের এই বিষাদ সাধারণ মানুষের বিষাদের মতো নয়; এটি হলো জাগতিক মায়ার সাথে পরম সত্যের লড়াই। যখন আমরা আমাদের কর্তব্য ভুলে মায়ার বশবর্তী হই, তখন আমাদের অবস্থা অর্জুনের মতো হয়।
ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে অতি-আবেগ অনেক সময় মানুষের বিচারবুদ্ধি কেড়ে নেয়। অর্জুন তাঁর আত্মীয়দের প্রতি আসক্তির কারণে ধর্ম ও অধর্মের পার্থক্য ভুলে গিয়েছিলেন। ভগবান কৃষ্ণ যখন দেখলেন অর্জুন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছেন, তখনই তিনি কথা বলতে শুরু করলেন। এটি আধ্যাত্মিক যাত্রার শুরু—যখন মানুষ নিজের অক্ষমতা বুঝতে পারে, তখনই ঈশ্বরের বাণীর প্রয়োজন হয়। এই বিষাদ থেকেই জন্ম নেবে পরম জ্ঞান।