॥ অধ্যায় ১, শ্লোক ৩৭ ॥

তস্মান্নার্হা বয়ং হন্তুং ধার্তরাষ্ট্রান্ সবান্ধবান্ ।
স্বজনং হি কথং হত্বা সুখিনঃ স্যাম মাধব ॥ ৩৭ ॥

সরল ভাবার্থ

অতএব, আমাদের উচিত নয় নিজেদের ভাই এবং আত্মীয়-বান্ধবদের হত্যা করা। হে মাধব! নিজের স্বজনদের হত্যা করে আমরা কীভাবে সুখী হতে পারব?

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

অর্জুন এখানে শ্রীকৃষ্ণকে 'মাধব' বলে সম্বোধন করেছেন। মাধব মানে সৌভাগ্যের দেবী লক্ষ্মীর স্বামী। অর্জুন যেন ইঙ্গিত করছেন যে, লক্ষ্মীর কৃপায় যে সুখ ও সমৃদ্ধি আসে, স্বজন হত্যার মাধ্যমে তা কোনোভাবেই লাভ করা সম্ভব নয়। তিনি কৌরবদের 'সবান্ধবান্' বা বন্ধুদের সাথে থাকা এক পরিবার হিসেবে দেখছেন। অর্জুনের মূল প্রশ্ন হলো—সুখ। তিনি ভাবছেন যে পৃথিবী জয়ের পর যখন কেউ তাঁর জয় দেখার জন্য বেঁচে থাকবে না, তখন সেই জয়ের সার্থকতা কোথায়?

এই শ্লোকটি মানুষের স্বার্থপরতা ও মোহের এক জটিল মিশ্রণ। অর্জুন যুদ্ধের ফল হিসেবে কেবল নিজের ব্যক্তিগত সুখ বা দুঃখের কথা ভাবছেন। তিনি জগতের কল্যাণের কথা ভুলে গেছেন। অধর্ম যখন মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সমাজকে রক্ষা করার জন্য ব্যক্তিগত শোক ত্যাগ করতে হয়। অর্জুন এখানে 'ক্ষমা' নামক গুণের ভুল প্রয়োগ করছেন। ক্ষমা কেবল তখনই মহৎ হয় যখন ক্ষমা করার শক্তি থাকে এবং যাকে ক্ষমা করা হচ্ছে সে তার ভুল বুঝতে পারে। কিন্তু কৌরবরা ছিল উদ্ধত ও অনমনীয়।

ধর্মীয় তত্ত্বে বলা হয় যে, সমাজকে পবিত্র করার জন্য অনেক সময় কঠোর অপারেশন প্রয়োজন। অর্জুন সেই সার্জন হতে ভয় পাচ্ছেন। তিনি ভাবছেন স্বজন হত্যার গ্লানি তাঁকে সারাজীবন দগ্ধ করবে। কিন্তু তিনি বুঝতে পারছেন না যে, আজ যুদ্ধ না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাঁকে একজন কাপুরুষ হিসেবে মনে রাখবে যে তাঁর পরিবারকে বাঁচাতে গিয়ে পুরো পৃথিবীর অধর্মকে প্রশ্রয় দিয়েছিল। অর্জুনের এই মানসিক অবস্থা আমাদের সবার জীবনের প্রতিচ্ছবি—যখন আমরা আবেগের বশবর্তী হয়ে আমাদের বড় দায়িত্বগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নেই।


[ছবি: অর্জুন রথের ওপর ম্লান মুখে বসে আছেন, আর পটভূমিতে যুদ্ধের দামামা বাজছে যা তাঁর মনের অস্থিরতাকে ফুটিয়ে তুলছে।]