॥ অধ্যায় ১, শ্লোক ১৪ ॥

ততঃ শ্বেতৈর্হয়ৈর্যুক্তে মহতি স্যন্দনে স্থিতৌ ।
মাধবঃ পাণ্ডবশ্চৈব দিব্যৌ শঙ্খৌ প্রদ্যম্মতুঃ ॥ ১৪ ॥

সরল ভাবার্থ

তারপর সাদা ঘোড়া দ্বারা টানা একটি বিশাল রথে চড়ে শ্রীকৃষ্ণ (মাধব) এবং অর্জুন তাঁদের দিব্য শঙ্খগুলো বাজালেন।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

এই শ্লোকটি গীতার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া শ্লোক। কৌরবদের রণকোলাহলের পর এখন পাণ্ডবদের পক্ষ থেকে উত্তর আসছে। এখানে শ্রীকৃষ্ণকে 'মাধব' এবং অর্জুনকে 'পাণ্ডব' বলে সম্বোধন করা হয়েছে। তাদের রথটি ছিল অত্যন্ত মহান এবং তাতে ছিল চারটি শ্বেত অশ্ব। সাদা রং হলো পবিত্রতা এবং জয়ের প্রতীক। কৌরবদের শঙ্খনাদ ছিল সাধারণ, কিন্তু কৃষ্ণ ও অর্জুনের শঙ্খকে বলা হয়েছে 'দিব্য' বা স্বর্গীয়।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোকটি শুভ অশুভের সংঘাতের বহিঃপ্রকাশ। 'মাধব' শব্দের অর্থ হলো লক্ষ্মীর স্বামী বা পরমেশ্বর। যখন স্বয়ং ঈশ্বর অর্জুনের রথের সারথি হিসেবে তাঁর শঙ্খ বাজাচ্ছেন, তখনই যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারিত হয়ে গেছে। ভগবান এখানে অর্জুনের চালক হিসেবে আবির্ভূত হয়ে আমাদের শেখাচ্ছেন যে, আমরা যদি আমাদের জীবনের রথ তাঁর হাতে ছেড়ে দিই, তবে বিজয় অবধারিত।

সাদা ঘোড়াগুলো পঞ্চেন্দ্রিয়ের প্রতীক, যা যখন ভগবানের নিয়ন্ত্রণে থাকে তখন তা পরম শান্তিতে চলে। কৌরবদের কোলাহল ছিল যান্ত্রিক, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের শঙ্খধ্বনি ছিল এক পবিত্র সংগীতের মতো, যা অধার্মিকদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করে আর ধার্মিকদের মনে সাহস যোগায়। এই শ্লোকটি আমাদের আশার কথা বলে—জীবনের ঘোর অন্ধকারেও যখন আমরা একা বোধ করি, তখন মনে রাখতে হবে শ্রীকৃষ্ণ আমাদের সারথি হিসেবে প্রস্তুত আছেন। তাঁর দিব্য শঙ্খধ্বনি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে অন্যায়ের শক্তি যতই চিৎকার করুক, সত্যের একটি ধ্বনিই তাকে স্তব্ধ করে দিতে পারে। এটিই হলো গীতার মূল রহস্যের শুরু।


[ছবি: অর্জুনের অপূর্ব সুন্দর রথ, যা চারটি সাদা ঘোড়ায় টানা, তাতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং অর্জুন দাঁড়িয়ে শঙ্খ বাজাচ্ছেন।]