॥ অধ্যায় ১, শ্লোক ২৩ ॥

য়োত্স্যমানানবেক্ষেঽহং য় এতেঽত্র সমাগতাঃ ।
ধার্তরাষ্ট্রস্য দুর্বুদ্ধের্য়ুদ্ধে প্রিয়চিকীর্ষবঃ ॥ ২৩ ॥

সরল ভাবার্থ

দুর্মতি দুর্যোধনের প্রিয় কামনা করে যারা এখানে তাঁর পক্ষে যুদ্ধ করার জন্য সমবেত হয়েছে, আমি তাদের একবার ভালো করে দেখে নিতে চাই।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

অর্জুন এখানে দুর্যোধনকে 'দুর্বুদ্ধেঃ' বা দুর্মতি বলে সম্বোধন করেছেন। এটি অত্যন্ত গভীর একটি সত্য। দুর্যোধন কেবল রাজা হতে চেয়েছিলেন তা নয়, তাঁর বুদ্ধি ছিল কুটিল এবং অধর্মপরায়ণ। অর্জুন অবাক হচ্ছিলেন যে, ভারতবর্ষের এত বড় বড় বীরেরা কেন এই দুর্মতি দুর্যোধনের পক্ষ নিয়েছেন। 'প্রিয়চিকীর্ষবঃ' শব্দটির অর্থ হলো—যারা কেবল তুষ্ট করার জন্য অন্যায়ের পাশে দাঁড়ায়। অনেক সময় আমরা জানি যে পথটি ভুল, কিন্তু ব্যক্তিগত স্বার্থ বা কাউকে খুশি করার জন্য আমরা সেই ভুল পথকেই সমর্থন করি। কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে এই বীরদের সমাবেশ ছিল ঠিক তেমনই এক ট্র্যাজেডি।

অর্জুন এখানে একজন বিচারকের মতো শত্রু পক্ষকে দেখতে চেয়েছেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন যে এই যুদ্ধটি কোনো ব্যক্তিগত ঝগড়া নয়, বরং এটি হলো শুভবুদ্ধি বনাম কুবুদ্ধির লড়াই। যারা দুর্যোধনের প্রিয় করার জন্য এসেছেন, তাঁরা আসলে নিজেদের বিনাশকেই ডেকে আনছেন। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, আমরা কার পাশে দাঁড়াচ্ছি সেটি আমাদের চরিত্রের পরিচয় দেয়। অসৎ মানুষের সঙ্গ এবং তাদের তোষামোদ করা মানুষকে নরকের পথে চালিত করে। অর্জুনের এই দেখার মধ্যে এক ধরণের বীরত্বপূর্ণ ঘৃণা ছিল সেই সব মানুষদের প্রতি, যারা জেনেবুঝে অন্যায়ের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু মানুষের মন বড় বিচিত্র। এই বীরত্বপূর্ণ ঘৃণা পরক্ষণেই মোহে রূপান্তরিত হবে। জীবনের বড় পরীক্ষায় বসার আগে আমরা প্রায়ই প্রতিপক্ষের ওপর দোষারোপ করি, কিন্তু গীতা আমাদের শেখাবে যে যুদ্ধটি বাইরের চেয়ে ভেতরের বেশি। অর্জুন কৌরবদের 'দুর্বুদ্ধি' বলে ডাকলেও শীঘ্রই তিনি নিজের বুদ্ধির স্থিরতা হারিয়ে ফেলবেন এবং ভগবানের শরণাগত হবেন।


[ছবি: অর্জুন অবজ্ঞার দৃষ্টিতে কৌরব শিবিরের প্রধান সেনাপতিদের দিকে তাকাচ্ছেন, দূরে দুর্যোধনকে তাঁর ভাইদের সাথে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে।]
>