॥ অধ্যায় ১, শ্লোক ৩২ ॥

ন কাঙ্ক্ষে বিজয়ং কৃষ্ণ ন চ রাজ্যং সুখানি চ ।
কিং নো রাজ্যেন গোবিন্দ কিং ভোগৈর্জীবিতেন বা ॥ ৩২ ॥

সরল ভাবার্থ

হে কৃষ্ণ! আমি বিজয় চাই না, রাজ্য চাই না এবং সুখও চাই না। হে গোবিন্দ! আমাদের রাজ্যে কী প্রয়োজন? ভোগবিলাসেই বা কী লাভ? আর এই জীবন রেখেই বা কী হবে?

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

এই শ্লোকটি অর্জুনের বৈরাগ্যের এক চরম বহিঃপ্রকাশ, কিন্তু এই বৈরাগ্যটি ছিল মেকি বা সাময়িক। অর্জুন বলছেন তিনি জয় চান না, রাজ্য চান না। তিনি শ্রীকৃষ্ণকে 'গোবিন্দ' বলে সম্বোধন করছেন। গোবিন্দ মানে যিনি ইন্দ্রিয়কে আনন্দ দান করেন। অর্জুন যেন বলছেন, হে গোবিন্দ! আমার ইন্দ্রিয় তো এখন বিষাদে পূর্ণ, আমি এই রাজ্য দিয়ে কী আনন্দ পাব?

ধর্মীয় দিক থেকে, অর্জুনের এই ত্যাগ কোনো ঋষির ত্যাগের মতো ছিল না, এটি ছিল ভয়ে এবং মোহে পালানোর চেষ্টা। প্রকৃত ত্যাগ হলো আসক্তি ত্যাগ করা, কর্তব্য ত্যাগ করা নয়। অর্জুন তাঁর কর্তব্য (যুদ্ধ) ত্যাগ করতে চাইছিলেন কিন্তু তাঁর আত্মীয়দের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করতে পারছিলেন না। তিনি ভাবছিলেন যে আত্মীয়দের হত্যা করে যদি রাজ্য পাওয়া যায়, তবে সেই জীবনই বৃথা। এখানে অর্জুন চরম নিরাশাবাদী বা নেতিবাচক হয়ে পড়েছেন। তিনি শ্রীকৃষ্ণকে বলছেন যে রাজ্য, ভোগ বা এমনকি জীবনও তাঁর কাছে অর্থহীন। এটিই হলো বিষাদ যোগের সেই সন্ধিক্ষণ যেখান থেকে ভগবান তাঁকে জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য বোঝানো শুরু করবেন। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আলস্য বা ভয়ে কাজ ছেড়ে দেওয়া 'ধর্ম' নয়; বরং ঈশ্বরের আজ্ঞায় অবিচল থেকে কাজ করে যাওয়া এবং ফলের আশা না করাই হলো প্রকৃত পূজা। অর্জুনের এই আর্তনাদ আসলে প্রত্যেকটি মানুষের আর্তনাদ যারা মায়ার মোহে পড়ে জীবনের লক্ষ্য ভুলে যায়।


[ছবি: অর্জুন রথের এক কোণে মুখ নিচু করে বসে আছেন এবং অত্যন্ত করুণ কণ্ঠে শ্রীকৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে তাঁর অনীহা প্রকাশ করছেন।]