॥ অধ্যায় ১, শ্লোক ৩৩ ॥

য়েষামর্থে কাঙ্ক্ষিতং নো রাজ্যং ভোগাঃ সুখানি চ ।
ত ইমেঽবস্থিতা যুদ্ধে প্রাণাংস্ত্যক্ত্বা ধনানি চ ॥ ৩৩ ॥

সরল ভাবার্থ

যাঁদের জন্য আমরা রাজ্য, ভোগ এবং সুখ কামনা করি, তাঁরাই আজ প্রাণ ও ধন-সম্পদের আশা ত্যাগ করে এই রণাঙ্গনে যুদ্ধের জন্য উপস্থিত হয়েছেন।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

অর্জুন এখানে মানুষের জীবনের এক চরম বাস্তবতার কথা বলছেন, কিন্তু তা মোহের আবরণে ঢাকা। মানুষের ধর্ম হলো পরিবারের কল্যাণ করা। অর্জুন ভাবছেন, যে রাজ্য বা ঐশ্বর্য তিনি অর্জন করতে যাচ্ছেন, তার সার্থকতা কী যদি সেই সুখ ভাগ করে নেওয়ার মতো প্রিয়জনই বেঁচে না থাকে? তিনি মনে করছেন, এই যুদ্ধ আসলে এক অর্থহীন রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। অর্জুন এখানে 'মমত্ব' বা 'আমার' এই বোধে গভীরভাবে আচ্ছন্ন। তাঁর যুক্তি হলো—যাদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য তিনি রাজা হতে চান, আজ তাদেরকেই নিজের হাতে হত্যা করতে হবে।

পারমার্থিক বিচারে, এটি হলো জীবের মায়া। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই শ্লোকের মাধ্যমে অর্জুনের ভেতরের সেই আসক্তিকে বাইরে বের করে আনছেন। অর্জুন ভুলে গেছেন যে, এই পৃথিবীতে কেউ কারো নয়; সবাই নিজ নিজ কর্মফল ভোগ করতে এসেছে। অর্জুন এখানে পার্থিব সুখকে চরম বলে মনে করছেন। তিনি ভাবছেন স্বজনরা থাকলেই কেবল সুখ পাওয়া সম্ভব। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এটি এক ধরণের 'অবিদ্যা'। অর্জুন মনে করছেন যে তিনি দয়ালু, কিন্তু আসলে তিনি তাঁর ক্ষত্রিয় দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হতে চাইছেন। তিনি ভোগের উৎস হিসেবে ব্যক্তিদের দেখছেন, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ চান তিনি আনন্দের উৎস হিসেবে ঈশ্বরকে দেখুক। অর্জুনের এই মানসিক অবস্থা আমাদের শেখায় যে, যখন আমরা কেবল ফলাফলের কথা চিন্তা করি এবং কর্তব্যের চেয়ে সম্পর্কের মায়াকে বড় করে দেখি, তখনই আমাদের মধ্যে বিষাদ জন্ম নেয়। অর্জুন এখানে এক ট্র্যাজিক হিরোর মতো কথা বলছেন, যা বীরত্বের পরিপন্থী।


[ছবি: অর্জুন বিষণ্ণ মনে কুরু সেনাদের দিকে তাকিয়ে ভাবছেন এবং তাঁর মনে আত্মীয়দের সাথে কাটানো সুখের স্মৃতি ভেসে উঠছে।]