সরল ভাবার্থ
তাঁরা হলেন—আচার্যগণ, পিতৃব্যগণ, পুত্রগণ, পিতামহগণ, মাতুলগণ, শ্বশুরগণ, পৌত্রগণ, শ্যালকগণ এবং অন্যান্য আত্মীয়স্বজন।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
অর্জুন এখানে তাঁর আত্মীয়দের এক দীর্ঘ তালিকা প্রস্তুত করেছেন। তিনি দেখছেন যে যুদ্ধের ময়দানটি আসলে একটি পরিবারেরই খণ্ডিত অংশ। একদিকে আছেন গুরু দ্রোণাচার্য, যাঁর কাছে তিনি অস্ত্রশিক্ষা নিয়েছেন। অন্যদিকে পিতামহ ভীষ্ম, যাঁর কোলে তিনি ছোটবেলায় খেলেছেন। আছেন মামা শল্য, শ্বশুর দ্রুপদ (যিনি যদিও পাণ্ডব পক্ষে কিন্তু অর্জুন তাঁকে উভয় পক্ষের আত্মীয় হিসেবে ভাবছেন) এবং দুর্যোধনের মতো ভাইয়েরা। অর্জুন এখানে 'রক্তের সম্পর্কের' জালে আটকা পড়েছেন।
ধর্মীয় তত্ত্বে একে বলা হয় 'মোহ'। মোহ মানুষকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। অর্জুন এখানে তাঁর ক্ষত্রিয় ধর্ম বা যোদ্ধার কর্তব্যের চেয়ে নিজের আত্মীয়তাকে বড় করে দেখছেন। তিনি ভুলে গেছেন যে, অধর্মের পক্ষ নিলে আত্মীয়ও ত্যাজ্য হয়। যেমনটি আমরা প্রহ্লাদ বা বিভীষণের ক্ষেত্রে দেখি। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, যখন সমাজ বা ধর্মের সাথে সম্পর্কের বিরোধ বাঁধে, তখন সাধারণ মানুষ অনেক সময় অধর্মের সাথে আপোষ করতে চায়। অর্জুন এখানে দয়ার ছদ্মবেশে আসলে তাঁর নিজের দুর্বলতাকেই প্রকাশ করছেন। তিনি ভাবছেন গুরু হত্যা বা পিতামহ হত্যা মহাপাপ। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ চান অর্জুন বুঝুক যে, অধর্ম যখন মানুষকে গ্রাস করে, তখন তাদের শরীর কেবল একটি মৃতদেহের সমান, যাকে ধ্বংস করাই হলো প্রকৃত ধর্ম। এই আত্মীয়দের প্রতি অর্জুনের যে মোহ, তা আসলে তাঁর আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে প্রধান অন্তরায়। অর্জুন এখানে নিজের বিবেকের সাথে লড়াই করছেন, যা শেষ পর্যন্ত তাঁকে শ্রীকৃষ্ণের চরণে পূর্ণ আত্মসমর্পণের দিকে নিয়ে যাবে।
[ছবি: অর্জুন রথের ওপর দাঁড়িয়ে একে একে প্রবীণ ও নবীন কৌরব যোদ্ধাদের লক্ষ্য করছেন এবং তাঁর মুখমণ্ডল করুণায় ম্লান হয়ে আসছে।]