॥ অধ্যায় ১, শ্লোক ৩৫ ॥

এতান্ন হন্তুম্ ইচ্ছামি ঘ্নতোঽপি মধুসূদন ।
অপি ত্রৈলোক্যরাজ্যস্য হেতোঃ কিং নু মহীকৃতে ॥ ৩৫ ॥

সরল ভাবার্থ

হে মধুসূদন! এরা আমাকে হত্যা করলেও আমি এদের মারতে চাই না। এমনকি তিন লোকের (স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল) রাজত্বের বিনিময়েও নয়, তাহলে এই পৃথিবীর সামান্য মাটির জন্য কেন মারব?

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

অর্জুন এখানে শ্রীকৃষ্ণকে 'মধুসূদন' বলে ডেকেছেন। মধু নামক অসুরকে যিনি বিনাশ করেছেন, তিনিই মধুসূদন। অর্জুন যেন প্রকারান্তরে বলছেন যে, অসুর মারা সহজ কিন্তু নিজের আত্মীয়দের মারা নয়। অর্জুনের এই উক্তি আপাতদৃষ্টিতে পরম বৈরাগ্যের মতো মনে হয়। তিনি বলছেন যে, কেবল এই পৃথিবী নয়, যদি তাঁকে স্বর্গের অধিপতিও করে দেওয়া হয়, তবুও তিনি তাঁর পিতামহ বা গুরুকে হত্যা করবেন না। এটি হলো অর্জুনের 'ভ্রান্ত অহিংসা'।

ধর্মীয় বিচার অনুযায়ী, অর্জুন এখানে সত্য ও কর্তব্যের চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে বড় করে দেখছেন। অধর্মের বিনাশ করার জন্য অনেক সময় অপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে হয়। অর্জুন ভাবছেন যে তিনি এদের হত্যা না করলে তিনি মহান হবেন। কিন্তু তিনি ভুলে গেছেন যে এই কৌরবরা কেবল তাঁর আত্মীয় নয়, তারা ধর্মের শত্রু। যদি তিনি তাদের ত্যাগ করেন, তবে পৃথিবীতে অন্যায়ের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। অর্জুনের এই ত্যাগ আসলে 'তামসিক ত্যাগ'—যা ভয় এবং মোহ থেকে উৎপন্ন হয়। তিনি নিজেকে একজন শান্তিবাদী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন, কিন্তু রণাঙ্গনে এই শান্তিবাদ আসলে কাপুরুষতারই নামান্তর। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের এই যুক্তিতে মোটেও খুশি হননি, কারণ তিনি জানেন যে এই মায়ার দেয়াল না ভাঙলে অর্জুন কোনোদিনও প্রকৃত সত্যে পৌঁছাতে পারবেন না। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, অনেক সময় আমাদের ত্যাগ বা দয়া আসলে আমাদের কর্তব্যের প্রতি অবহেলা ছাড়া আর কিছুই নয়।


[ছবি: অর্জুন হাত জোড় করে রথের ওপর বসে আছেন এবং আকাশের দিকে তাকিয়ে তিন লোকের রাজত্বের অসারতা বর্ণনা করছেন।]