সরল ভাবার্থ
হে জনার্দন! ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হত্যা করে আমাদের কী আনন্দ হবে? এই আততায়ীদের হত্যা করলে আমাদের পাপই স্পর্শ করবে।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
অর্জুন এখানে শ্রীকৃষ্ণকে 'জনার্দন' বলে ডাকছেন। জনার্দন মানে যিনি জনগণের দুঃখ দূর করেন। অর্জুন যেন বলতে চাইছেন যে, আপনি যদি মানুষের দুঃখ দূর করেন, তবে আমাকে কেন স্বজনদের হত্যার মাধ্যমে দুঃখ দিচ্ছেন? অর্জুন শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে বলছেন যে আততায়ীদের হত্যা করা উচিত, কিন্তু যেহেতু তারা আত্মীয়, তাই তাদের মারলে পাপ হবে। হিন্দু শাস্ত্রে ৬ ধরণের মানুষকে 'আততায়ী' বলা হয়েছে—যারা বিষ দেয়, ঘরে আগুন দেয়, অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করে, ধন কেড়ে নেয়, জমি দখল করে এবং অন্যর স্ত্রীকে হরণ করে। কৌরবরা এই ছয়টি কাজই পাণ্ডবদের সাথে করেছে।
শাস্ত্র মতে আততায়ীদের হত্যা করলে কোনো পাপ হয় না। কিন্তু অর্জুনের বিচারবোধ এখন মায়ার দ্বারা আবৃত। তিনি মনে করছেন যে 'স্বজন হত্যা' বা 'কুল ক্ষয়' করলে তিনি নরকগামী হবেন। এটি একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য—যেখানে অর্জুন স্বয়ং ঈশ্বরের সামনে দাঁড়িয়ে পাপ-পুণ্যের বিচার করছেন! অর্জুন এখানে তাঁর ক্ষত্রিয় ধর্ম (অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা) এবং তাঁর পারিবারিক আবেগের মধ্যে দ্বন্দ্বে ফেঁসে গেছেন। তিনি মনে করছেন যে যুদ্ধ জয়ের পর যে সুখ পাওয়া যাবে তা ক্ষণস্থায়ী এবং পাপের বোঝা বয়ে বেড়াতে হবে সারা জীবন। এই শ্লোকটি আমাদের জীবনের একটি বড় শিক্ষা দেয়—যখন আমরা খুব ভয় পাই, তখন আমরা ভুল শাস্ত্রীয় যুক্তি দিয়ে নিজেদের দুর্বলতাকে ঢাকতে চাই। অর্জুনও এখানে তাঁর ভয়কে 'ধর্মীয় বিধি' হিসেবে চালানোর চেষ্টা করছেন। শ্রীকৃষ্ণ পরবর্তীতে তাঁকে বোঝাবেন যে, শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছায় করা যুদ্ধ কোনো পাপ নয়, বরং তা পরম ধর্ম।
[ছবি: অর্জুন দুই হাতে নিজের কপাল চেপে ধরে অপরাধবোধে ভুগছেন, অন্যদিকে কৃষ্ণ শান্ত মুখে তাঁর কথা শুনছেন।]