॥ অধ্যায় ১, শ্লোক ৪৪ ॥

উৎসন্নকুলধর্মাণাং মনুষ্যাণাং জনার্দন ।
নরকেঽনিয়তং বাসো ভবতীত্যনুশুশ্রুম ॥ ৪৪ ॥

সরল ভাবার্থ

হে জনার্দন! আমরা শুনেছি যে যাদের কুলধর্ম বিনষ্ট হয়েছে, সেই সমস্ত মানুষদের চিরকাল নরকে বাস করতে হয়।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

অর্জুন এখানে শ্রীকৃষ্ণকে আবার 'জনার্দন' বলে সম্বোধন করছেন। তিনি শাস্ত্রীয় জ্ঞানের দোহাই দিয়ে বলছেন—'অনুশুশ্রুম' অর্থাৎ 'আমরা লোকমুখে শুনেছি' বা 'শাস্ত্রানুসারে জেনেছি'। তাঁর ধারণা, কুলধর্ম নষ্ট হওয়া একটি অমার্জনীয় অপরাধ এবং এর ফলস্বরূপ নরকে অনন্তকাল বাস করতে হয়। অর্জুনের এই উক্তি প্রমাণ করে যে তিনি শাস্ত্রীয় বচনের বাহ্যিক অর্থ জানতেন, কিন্তু তার অন্তর্নিহিত গূঢ় রহস্য বুঝতেন না।

ধর্মীয় বিচারে, নরক বলতে কেবল একটি স্থান নয়, এটি হলো মানসিক অশান্তি ও বিবেকের দহনের এক চরম অবস্থা। অর্জুন ভয় পাচ্ছেন যে যুদ্ধ করলে তাঁর বিবেক তাঁকে চিরদিন দগ্ধ করবে। কিন্তু তিনি ভুলে গেছেন যে স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যার রথ পরিচালনা করছেন, তাঁকে কোনো নরক গ্রাস করতে পারে না। অর্জুন এখানে তাঁর পূর্বপুরুষদের এবং উত্তরসূরিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত চিন্তিত।

অর্জুনের এই যুক্তি আসলে মায়ার একটি সূক্ষ্ম জাল। মানুষ যখন কোনো সত্য কাজ করতে ভয় পায়, তখন সে নরকের ভয় বা পরকালের ভয়ের দোহাই দিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করে। তিনি ভাবছেন তিনি যদি যুদ্ধ না করেন তবেই তিনি ধার্মিক থাকবেন। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ চান অর্জুন বুঝুক যে, অধর্ম যখন সমাজকে ঘিরে ফেলে, তখন যুদ্ধ করাই হলো স্বর্গের পথ এবং কাপুরুষতাই হলো নরকের পথ। অর্জুনের এই মানসিক অবস্থা আমাদের শেখায় যে, আংশিক শাস্ত্রীয় জ্ঞান মানুষকে আরও বেশি বিভ্রান্ত করতে পারে। প্রকৃত জ্ঞান হলো ঈশ্বরের ইচ্ছার কাছে নিজেকে সমর্পণ করা।
[ছবি: অর্জুন হাত জোড় করে শ্রীকৃষ্ণকে মিনতি করছেন এবং তাঁর মনে নরকের বিভীষিকার এক অস্পষ্ট ছায়া ভেসে উঠছে।]