॥ অধ্যায় ১, শ্লোক ৪৫ ॥

অহো বত মহৎ পাপং কর্তুং ব্যবসিতা বয়ম্ ।
য়দ্রাজ্যসুখলোভোন হন্তং স্বজনমুদ্যতাঃ ॥ ৪৫ ॥

সরল ভাবার্থ

হায়! আমরা কী নিদারুণ পাপ করতে প্রবৃত্ত হয়েছি। সামান্য রাজত্বের লোভে আমরা স্বজনদের হত্যা করতে উদ্যত হয়েছি।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

অর্জুন এখানে 'অহো বত'—এই শব্দের মাধ্যমে তাঁর চরম অনুশোচনা ও পরিতাপ প্রকাশ করছেন। তিনি নিজেকে এবং তাঁর ভাইদের অপরাধী মনে করছেন। অর্জুনের দৃষ্টিতে এই যুদ্ধটি হলো কেবল 'রাজ্যসুখলোভ' বা রাজ্য ভোগের লালসা। তিনি ভুলে গেছেন যে এই যুদ্ধটি কেবল মাটির দখল নেওয়ার জন্য নয়, বরং এটি হলো ধর্মের সংস্থাপনের জন্য। অর্জুনের এই মানসিক অবস্থা প্রমাণ করে যে তিনি চরম বিষাদে ডুবে গেছেন।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, এই শ্লোকটি মানুষের বিবেক ও মোহের দ্বন্দ্বকে ফুটিয়ে তোলে। অর্জুন ভাবছেন তিনি অত্যন্ত মহান কারণ তিনি পাপ থেকে দূরে থাকতে চাইছেন। কিন্তু তিনি শ্রীকৃষ্ণের পরিকল্পনা বুঝতে পারছেন না। তিনি নিজেকে এবং পাণ্ডবদের লোভী বলে অপবাদ দিচ্ছেন। তিনি মনে করছেন যে এত বছর ধরে তাঁরা যে দুঃখ সহ্য করেছেন, তা মুখ বুজে সহ্য করে যাওয়াই ছিল প্রকৃত ধর্ম।

অর্জুন এখানে এক ধরণের নেতিবাচক বৈরাগ্যে আক্রান্ত। এই বৈরাগ্যটি ত্যাগ থেকে নয়, বরং অবসাদ থেকে জন্মেছে। তাঁর মনে হচ্ছে স্বজন হত্যা করে যে জয় আসবে, তা হবে রক্তের কালিতে লেখা এক কলঙ্কিত ইতিহাস। অর্জুনের এই আবেগঘন উক্তি আমাদের সবার জীবনের প্রতিচ্ছবি—যখন আমরা কোনো মহান লক্ষ্য অর্জন করতে গিয়ে পথের বাধাকে দেখে ঘাবড়ে যাই এবং লক্ষ্যটিকেই ভুল বা লোভী বলে মনে করতে শুরু করি। শ্রীকৃষ্ণ এখানে নীরব থেকে অর্জুনের ভেতরের সমস্ত মালিন্য ও দুর্বলতাকে বাইরে বের হয়ে আসার সুযোগ দিচ্ছেন, যাতে পরে জ্ঞানের আলোয় তাকে ধুয়ে ফেলা যায়।


[ছবি: অর্জুন রথের এক কোণে নিজের হাত দিয়ে চোখ ঢেকে ডুকরে কাঁদছেন এবং অত্যন্ত করুণ কণ্ঠে নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছেন।]