॥ অধ্যায় ১, শ্লোক ৪৬ ॥

য়দি মামপ্রতীকারমশস্ত্রং শস্ত্রপাণয়ঃ ।
ধার্তরাষ্ট্রা রণে হন্যুস্তন্মে ক্ষেমতরং ভবেৎ ॥ ৪৬ ॥

সরল ভাবার্থ

আমি যদি সশস্ত্র ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের দ্বারা নিরস্ত্র এবং কোনো রকম প্রতিরোধ না করে যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হই, তবে তাও আমার পক্ষে অত্যন্ত মঙ্গলজনক হবে।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

অর্জুন এখানে বিষাদের এক চরম সীমায় পৌঁছেছেন। তিনি যুদ্ধের কথা ভুলে গিয়ে আত্মবিসর্জনের কথা ভাবছেন। তিনি বলছেন যে তিনি অস্ত্র ত্যাগ করবেন এবং ধৃতরাষ্ট্রের পুত্ররা যদি তাঁকে সেই অবস্থায় হত্যাও করে, তবুও তিনি সুখী হবেন। অর্জুনের এই 'অপ্রতীকার' বা প্রতিরোধহীনতা আসলে তাঁর ক্ষত্রিয় ধর্মের মূলে কুঠারাঘাত। একজন ক্ষত্রিয়র ধর্ম হলো সত্যের জন্য লড়াই করা, কিন্তু অর্জুন এখানে মায়ার বশবর্তী হয়ে আত্মহত্যাসম সিদ্ধান্ত নিতে চাইছেন।

ধর্মীয় বিচারে, অর্জুন এখানে এক ধরণের মেকি অহিংসার আশ্রয় নিচ্ছেন। তিনি ভাবছেন তিনি যদি মরে যান তবে যুদ্ধ থেমে যাবে এবং অনেক মানুষ বেঁচে যাবে। কিন্তু তিনি বুঝতে পারছেন না যে, অন্যায়ের সামনে মাথানত করা আর অন্যায় করা—উভয়ই সমান পাপ। অর্জুন এখানে তাঁর বীরত্বকে বিসর্জন দিয়ে করুণার পাত্র হতে চাইছেন।

শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের এই অবস্থা লক্ষ্য করছেন এবং বুঝতে পারছেন যে অর্জুনের মন এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, মানুষ যখন চরম হতাশ হয়, তখন সে তার জীবনের মূল উদ্দেশ্য ভুলে গিয়ে মৃত্যুর মধ্যে শান্তি খোঁজার চেষ্টা করে। অর্জুনের এই উক্তিটি ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম দুর্বলতম মুহূর্ত। তিনি ভাবছেন মরে গিয়ে তিনি তাঁর বংশ রক্ষা করবেন, কিন্তু আসলে তিনি ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ চিরতরে নষ্ট করার কথা বলছেন। এই অসহায় আত্মসমর্পণই শেষ পর্যন্ত তাঁকে শ্রীকৃষ্ণের সেই অমোঘ উপদেশের দিকে নিয়ে যাবে যেখানে তিনি শিখবেন—আত্মা অমর এবং সত্যের জন্য মৃত্যুবরণ করাও এক পরম ধর্ম।


[ছবি: অর্জুন তাঁর গাণ্ডীব ধনুক একপাশে সরিয়ে রেখে রথের মেঝেতে দুই হাত প্রসারিত করে অসহায় ভাবে বসে আছেন।]